Sunday 14 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ফিরছে না গ্রাহকদের আস্থা / ৬ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের পর ইসলামী ব্যাংকেও অর্থ উত্তোলনের চাপ

আদিল খান স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১৪ জুন ২০২৬ ২১:৩২ | আপডেট: ১৪ জুন ২০২৬ ২৩:০৩

ঢাকা: দেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক-ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশকে ঘিরে সাম্প্রতিক অস্থিরতা আমানতকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে এ সংকট তৈরি হয়েছে। তার নিয়োগের পর গ্রাহকরা অস্বাভাবিক হারে আমানত উত্তোলন শুরু করেন। এসময় ইসলামী ব্যাংকের প্রায় সব শাখায় গ্রাহকরা চাহিদামতো অর্থ উত্তোলন করতে না পারার আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে ৬টি দুর্বল ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকরা টাকা উত্তোলনে ভোগান্তির মুখে রয়েছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্বক্ষণিক নজরদারির পরও এসব ব্যাংকের গ্রাহকরা টাকা তুলতে না পেরে আস্থা হারিয়েছেন। এখন দেশের বৃহত্তম ইসলামী ব্যাংকের এমন অভিযোগ সামনে আসায় পুরো ইসলামী ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থার সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে সংকট সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক নিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করলেও গ্রাহক আস্থা ফিরেনি। আর স্টান্ডার্ড এবং আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরাও ইচ্ছামত টাকা তুলতে না পারায় গ্রাহকদের আস্থা তলানিতে ঠেকেছে।

ইসলামী ব্যাংক ঘিরে চলমান পরিস্থিতিতে গত ১২ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান আমানতকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকরা যেকোনো সময় তাদের টাকা তুলতে পারবেন। তাদের কোনো অসুবিধা হবে না। প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।’

তবে ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি এবং গভর্নরের আশ্বাস সত্ত্বেও গ্রাহকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা কাটছে না। বিশেষ করে গত সপ্তাহে ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা ও এটিএম থেকে অর্থ উত্তোলনে সমস্যার অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ার পর উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

ইসলামী ব্যাংকের হেড অফিস কমপ্লেক্স ভবন শাখার গ্রাহক বাবুল হোসেন জানান, গত বুধবার (১০ জুন) ও বৃহস্পতিবার (১১ জুন) তিনি শাখায় গিয়ে চেকের মাধ্যমে টাকা তুলতে পারেননি। শাখা ব্যবস্থাপক তাকে আপাতত টাকা উত্তোলন না করার পরামর্শ দেন। পরে তিনি রাজধানীর মুগদা, মতিঝিল, দিলকুশা, কারওয়ান বাজার এবং মালিবাগে এটিএম থেকে টাকা তুলতে ব্যর্থ হন তিনি। এমনকি অন্য ব্যাংকের এটিএম থেকেও শুক্রবার রাত পর্যন্ত টাকা তুলতে পারেননি তিনি।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন হবিগঞ্জ শাখার গ্রাহক হাবিবা ও রংপুরের ধাপ শাখার গ্রাহক আলী হোসেন। আলী হোসেন জানান, গত বৃহস্পতিবার তিনি ১০ লাখ টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করেও সফল হননি। তার মতো একই ভুক্তভোগী রাজধানীর নিউমার্কেট শাখার গ্রাহক ফাহিমা ইয়াসমিন। তিনি বলেন, কয়েকদিন ধরে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে যা হচ্ছে, মনে হয় টাকা ফের কেউ নিয়ে যাবে। মঙ্গলবার (৯ জুন) শাখা ব্যবস্থাপক বলেছিল, টাকা যখন চাইবেন, তখন তুলতে পারবেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার (১১ জুন) চেক নিতে অস্বীকৃতি জানায়। আগেও তৎকালিন গভর্নর আহসান এইচ মনসুররে কথা শুনে ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে ৫ লাখ টাকা তুলতে পারেননি তি‌নি।

গত ১০ জুন ব্যাংকারদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন ইসলামী ব্যাংকে চলমান অস্থিরতা নিয়ে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সংগঠনটি জানায়, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সমস্যার দ্রুত সমাধান হলে এর প্রভাব সব ব্যাংকের ওপর পড়বে।

শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দিন বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের অস্থিরতার প্রভাব এরইমধ্যে অন্যান্য ব্যাংকেও পড়তে শুরু করেছে। ইসলামী ব্যাংক দেশের মোট রেমিট্যান্স আহরণের একটি বড় অংশ পরিচালনা করে। ফলে ব্যাংকটির ওপর আস্থা কমে গেলে পুরো ইসলামী ব্যাংকিং খাতের জন্য তা বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’

ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)মুহাম্মদ আলতাফ হোসেন সারাবাংলাকে জানান, গত বৃহস্পতিবার কিছু শাখায় বড় অঙ্কের চেক নগদায়নে সাময়িক সমস্যা হয়েছিল। তবে গভর্নর যেহেতেু আশ্বাস দিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী সারাবাংলাকে বলেন, ‘ব্যাংকিং ব্যবস্থা মূলত আস্থার ওপর পরিচালিত হয়। গভর্নর কথা দিয়েছেন মানে গ্রাহকরা টাকা পাবেন। আমরা সবকছিু নজরদারিতে রেখেছিলাম। তবুও কিছু ব্যাংকের গ্রাহক তখন টাকা উত্তোলন করতে পারেনি, এটা সত্য।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশের ১০টি ইসলামী ব্যাংকে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এককভাবে ইসলামী ব্যাংকের আমানত রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া ব্যাংকটির মাধ্যমে এ পর্যন্ত প্রায় ৮৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে।

ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সম্প্রতি নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অনিশ্চয়তার মধ্যে কয়েকদিন ধরে গ্রাহকরা অস্বাভাবিক হারে আমানত উত্তোলন শুরু করেন। এর ফলে গত বুধবার (১০ জুন) ও বৃহস্পতিবার (১১ জুন) কিছু শাখায় নগদ অর্থের চাপ তৈরি হয়।

তবে ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, শুধু আশ্বাস নয়, আস্থা পুনরুদ্ধারে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট-এর অধ্যাপক ড. আহসান হাবীব সারাবাংলা‌কে বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স প্রবাহে ব্যাংকটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

এদিকে শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সচেতন গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক অধ্যাপক নুর উন-নবী ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং নতুন চেয়ারম্যানের অপসারণসহ ৭ দফা দাবি তুলে ধরেন।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দেশের ছয়টি দুর্বল শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের পর যদি ইসলামী ব্যাংককে ঘিরেও অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে পুরো ইসলামী ব্যাংকিং খাতে গ্রাহক আস্থার সংকট আরও প্রকট হতে পারে।

এদিকে রোববার (১৪ জুন) আমানতকারীদের স্বার্থে ও জনস্বার্থে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানসহ সব পরিচালকের নিয়োগ বাতিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৭(৩) ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে পর্ষদের যাবতীয় ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

আদিল খান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর