ঢাকা: সরকারি-বেসরকারি মিশ্র মালিকানার ‘বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক পিএলসি’তে চেয়ারম্যানের পরিবারের প্রভাব নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমানের পুত্রবধূ তানজিনা সুলতানা (রিমা)কে ঘিরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি, বদলি ও নিয়োগে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে চেয়ারম্যান কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সারাবাংলার এই প্রতিনিধিকে বলেন, ‘বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার বাইরে প্রভাব খাটানো হচ্ছে।’ তাদের দাবি, রাজধানীর দিলকুশা শাখায় কর্মরত চেয়ারম্যানের পুত্রবধূ তানজিনা সুলতানা রিমার মাধ্যমে অনেক বিষয়ে সুপারিশ ও তদবির করা হয় এবং পরে তা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন চেয়ারম্যান।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনর্গঠিত পরিচালনা পর্ষদের অধীনে মো. আতাউর রহমানকে কমার্স ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগপত্রে তার মেয়াদ প্রযোজ্য নয় বলে উল্লেখ রয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ব্যাংকটির বিভিন্ন সিদ্ধান্তে চেয়ারম্যানের সক্রিয় হস্তক্ষেপ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এর মধ্যে সাবেক এমডি মোহাম্মদ মোশারফ হোসেনের পদত্যাগও আলোচনায় আসে। সে সময় গণমাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন, ‘ব্যাংকে কাজ করার পরিবেশ ছিল না এবং প্রায় সব কাজেই চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের হস্তক্ষেপ থাকায় দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে পড়েছিল।’
এমডির গাড়ি ব্যবহার করেন চেয়ারম্যান
ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, এমডির জন্য বরাদ্দ করা গাড়ি চেয়ারম্যান নিজে ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পরও তিনি নিয়মিত বড় কক্ষে বসে অফিস পরিচালনা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
চেয়ারম্যান না কি ব্যাংকের একটি পাজেরো গাড়ি ব্যবহার করেন, যেটা মূলত এমডির ব্যবহারের কথা— এ বিষয়ে জানতে চাইলে কর্মাস ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওবায়দুল হক সারাবাংলাকে বলেন, ‘হ্যাঁ পাজেরো গাড়িটা স্যার ব্যবহার করেন। ওই গাড়িতে তিনি কমফোর্ট ফিল করেন। স্যার আগে যে হ্যারিয়ার গাড়িটা ব্যবহার করতেন, সেটা এখন আমি ব্যবহার করছি। আর ওই পাজেরো গাড়িটার কথা যেটা বললেন, ওটা উনার কাছেই থাকে।’
পুত্রবধূর ‘তদবিরে’ চেয়ারম্যানের ‘সায়’
অপরদিকে সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর স্মারক নম্বর BCL/HO/HRD/24/2025/1480-এর মাধ্যমে চেয়ারম্যানের পুত্রবধূ তানজিনা সুলতানাকে সহকারী কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার মাসিক বেতন নির্ধারণ করা হয় ৪০ হাজার ৯৫০ টাকা। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর রাজধানীর দিলকুশা শাখায় পদায়ন নেন তিনি।
কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ, গত দেড় মাসে প্রায় ৫০ জন কর্মকর্তার বদলির পেছনে তার প্রভাব ছিল। একই সঙ্গে কিছু পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও তুলেছেন তারা। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ব্যাংকের সূত্রগুলো আরও জানায়, এক পর্যায়ে ৩১৮ জন কর্মকর্তাকে একযোগে পদোন্নতি দেওয়া হয়। বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় বড় আকারের নতুন নিয়োগের প্রস্তুতিও চলছে বলে তাদের দাবি। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে সারাবাংলাকে বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে চেয়ারম্যানের প্রভাব অনেক বেড়েছে এবং বিভিন্ন কারণে কয়েকজন পরিচালক তার অবস্থানের কাছে কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছেন।’ তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ অবগত রয়েছে বলেও দাবি তার।
যা বলছেন এমডি ও সংশ্লিষ্টরা
বদলি-পদোন্নতি ও নিয়োগ বাণিজ্য বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যাংকের এমডি মো. ওবায়দুল হক বলেন, ‘ব্যাংকের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি, বদলি বাণিজ্য এবং পদোন্নতিসংক্রান্ত বিষয়গুলো আমিও শুনেছি। তবে বিস্তারিত জানি না। আমি নতুন জয়েন করেছি, বেশিদিন হয়নি।’ এ বিষয়ে জেনে দ্রুতই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। আর ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান হাসান মাহমুদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে মন্তব্য করতে তার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।’
অন্যদিকে চেয়ারম্যানের পুত্রবধূ তানজিনা সুলতানার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানতে চান, তার ব্যক্তিগত নম্বর কে দিয়েছেন? এরপর তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক একসময় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকগুলোর একটি হিসেবে আলোচনায় ছিল। ব্যাংকটির অর্ধেকের বেশি শেয়ার সরকারের হাতে রয়েছে। সম্প্রতি ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।