বাঙালি নারীর রূপচর্চা আর ঐতিহ্যের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আলতা, কপালে লাল টিপ আর নাকের নোলক। যুগে যুগে কবি-সাহিত্যিকরা নারীর এই নাকের নোলক নিয়ে কতই না কাব্য রচনা করেছেন। কালের বিবর্তনে ফ্যাশনের অনেক কিছুই বদলে গেছে, কিন্তু নাকের নোলকের আবেদন এতটুকু কমেনি। অতীতে নোলক বা নাকফুলকে কেবলই বিবাহিত নারীর প্রতীক কিংবা পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে এটি সংস্কৃতির গণ্ডি পেরিয়ে আধুনিক ফ্যাশন স্টেটমেন্টের এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। জিন্স-টপস হোক কিংবা জমকালো জামদানি শাড়ি,সব ধরনের পোশাকের সঙ্গেই এখনকার তরুণীরা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে নাকের নোলক বা নাকফুল পরছেন। সাজের মাঝে ভিন্নধর্মী একটি লুক এনে দিতে এবং নিজের ব্যক্তিত্বকে একটু আলাদাভাবে ফুটিয়ে তুলতে নাকের এই ছোট্ট গয়নাটি এখন ফ্যাশন সচেতন নারীদের প্রথম পছন্দ।
ঐতিহ্যের নোলক থেকে আজকের আধুনিক ফ্যাশন ট্রেন্ড
নাক ফোঁড়ানোর ইতিহাস এ দেশে বহু প্রাচীন হলেও সময়ের সাথে সাথে এর নকশা এবং পরার ধরনে এসেছে বিশাল পরিবর্তন। একসময় শুধু সোনার তৈরি খাঁটি ঐতিহ্যবাহী বড় নোলক বা টানা নোলকের চল ছিল, যা সাধারণত বিয়ে বা বড় কোনো উৎসব-অনুষ্ঠানে পরা হতো। তবে আজকের ফ্যাশন দুনিয়ায় নোলক কেবল বিশেষ দিনের সাজেই সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমানের তরুণীরা প্রতিদিনের সাধারণ সাজপোশাকের সাথেও মানানসই নোলক বেছে নিচ্ছেন। এখন সোনা বা রূপার পাশাপাশি মেটাল, কপার, হীরা, মুক্তা এবং বিভিন্ন রঙিন পাথরের ছোট-বড় হরেক রকমের নোলক বাজারে বেশ জনপ্রিয়। রূপালী বা অক্সিডাইজড মেটালের নোলকগুলো ফিউশন বা ক্যাজুয়াল লুকের সাথে দারুণ মানিয়ে যায়। অন্যদিকে সোনালী রঙের সূক্ষ্ম কারুকাজের নোলকগুলো যেকোনো ঐতিহ্যবাহী উৎসবের সাজে রাজকীয় আভিজাত্য এনে দেয়। ফলে আধুনিক নারীরা তাদের পোশাকের ধরন এবং ব্যক্তিগত রুচির ওপর ভিত্তি করে খুব সহজেই নিজের পছন্দের নোলকটি বেছে নিতে পারছেন।
পোশাকের সাথে মানানসই নোলক নির্বাচন ও সঠিক যত্ন
নাকের নোলক দিয়ে নিজের সাজকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পোশাক এবং মুখের গড়নের সাথে এর সামঞ্জস্য থাকা ভীষণ জরুরি। সাধারণত গোল বা ডিম্বাকৃতির মুখের নারীদের যেকোনো আকৃতির নোলক বা নাকফুল খুব সহজেই মানিয়ে যায়। তবে যাদের মুখের গড়ন একটু লম্বাটে বা চারকোনা, তারা সামান্য বড় বা টানা নোলক পরলে মুখের মায়াবী ভাব আরও ফুটে ওঠে। সুতি শাড়ি, কুর্তি বা সালোয়ার-কামিজের মতো সাধারণ পোশাকের সাথে মেটালের বা পাথরের ছোট নোলক বেশ মানানসই। আবার বিয়ে বা আকদের মতো বড় অনুষ্ঠানে ভারী কাজের নথ বা টানা দেওয়া সোনার নোলক কনের সাজকে পূর্ণতা দেয়। নোলক পরার ক্ষেত্রে ত্বকের সুরক্ষার বিষয়টিও মাথায় রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে সংবেদনশীল ত্বকের ক্ষেত্রে ভালো মানের ধাতু বেছে নেওয়া উচিত যেন অ্যালার্জি বা ইনফেকশনের ঝুঁকি না থাকে। নিয়মিত ব্যবহারের পর নোলকটি পরিষ্কার ও শুকনো স্থানে সংরক্ষণ করলে এর উজ্জ্বলতা দীর্ঘ সময় বজায় থাকে। এই চিরায়ত গয়নাটি শুধু সাজেরই অংশ নয়, এটি বাঙালি নারীর চিরন্তন সৌন্দর্য ও আধুনিক রুচিবোধের এক চমৎকার প্রকাশ।