আকাশে ওড়ার স্বপ্ন মানুষকে সবসময়ই এক টানটান উত্তেজনার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আর সেই আকাশ যদি হয় পৃথিবীর অন্যতম বিপজ্জনক আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর, তবে তো কথাই নেই। ইতিহাসের পাতায় ঠিক এমন এক রূপকথার মতো অথচ বাস্তব বীরত্বের জন্ম দিয়েছিলেন কিংবদন্তি বৈমানিক অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট। মার্কিন বৈমানিক চার্লস লিন্ডবার্গ প্রথম মানব হিসেবে একক ও বিরতিহীনভাবে বিমান চালিয়ে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার ঠিক পাঁচ বছর পর, ১৯৩২ সালের ২১ মে এই অসাধ্য সাধন করেন অ্যামেলিয়া। তিনি ছিলেন বিশ্বের প্রথম নারী, যিনি একা একটি বিমান নিয়ে উত্তাল আটলান্টিকের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে উড়ে গিয়ে ইতিহাস ওলটপালট করে দিয়েছিলেন। সে যুগের সামাজিক প্রেক্ষাপটে যেখানে নারীদের ঘরের বাইরের সাধারণ কাজেই নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হতো, সেখানে অ্যামেলিয়ার এই আকাশ জয় কেবল একটি রেকর্ড ছিল না, বরং তা ছিল বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি নারীর আত্মবিশ্বাসের এক নতুন দিগন্ত।
এক রোমাঞ্চকর যাত্রার সূচনা
১৯৩২ সালের ২০ মে, ঠিক লিন্ডবার্গের ঐতিহাসিক ফ্লাইটের পাঁচ বছর পূর্তির দিনেই অ্যামেলিয়া নিউফাউন্ডল্যান্ডের হারবার গ্রেস থেকে তার লাল রঙের ‘লকহিড ভেগা ৫বি’ বিমানটি নিয়ে আকাশে ডানা মেলেন। তার লক্ষ্য ছিল সরাসরি প্যারিসে পৌঁছানো, ঠিক যেভাবে লিন্ডবার্গ পৌঁছেছিলেন। এই দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় তার সঙ্গী ছিল মাত্র একটি থার্মোফ্লাস্কে ভরা গরম স্যুপ আর এক ক্যান টমেটোর রস। তখনকার দিনে আজকের মতো উন্নত জিপিএস, রাডার বা স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন সিস্টেম ছিল না। সম্পূর্ণ যাত্রাটি করতে হতো কেবল নিজের অভিজ্ঞতা, সাহস এবং অলটিমিটার ও কম্পাসের ওপর ভরসা করে। আটলান্টিকের কনকনে ঠান্ডা বাতাস আর একাকীত্বের মাঝে লাল রঙের সেই ছোট্ট বিমানটি যখন মেঘের বুক চিরে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন পুরো বিশ্ব অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল এই দুঃসাহসিক নারীর সফলতার খবর শোনার জন্য।
আকাশের বুকে ঝড় আর যান্ত্রিক গোলযোগের পরীক্ষা
তবে অ্যামেলিয়ার এই মহাজাগতিক যাত্রা মোটেও মসৃণ ছিল না, বরং মাঝ-আকাশে তাকে আক্ষরিক অর্থেই মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সাগরের ওপর দিয়ে ওড়ার কিছু সময় পরই শুরু হয় প্রচণ্ড ঝড় আর ঘন মেঘ। চারদিকের তীব্র ঠান্ডায় বিমানের ডানায় বরফ জমতে শুরু করে, যার ফলে বিমানটি ভারী হয়ে নিচের দিকে নামতে বাধ্য হচ্ছিল। এর ওপর যোগ হয়েছিল মারাত্মক যান্ত্রিক গোলযোগ; বিমানের অলটিমিটার বা উচ্চতা মাপার যন্ত্রটি হুট করেই কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ফলে তিনি সাগরপৃষ্ঠ থেকে ঠিক কতটা উঁচুতে আছেন, তা বোঝার কোনো উপায় ছিল না। আরও ভীতিজনক বিষয় ছিল, বিমানের ইঞ্জিন থেকে জ্বালানি লিক করার শব্দ ও গন্ধ পাচ্ছিলেন তিনি। যেকোনো মুহূর্তে ইঞ্জিন বিকল হয়ে আটলান্টিকের কনকনে ঠান্ডা পানিতে আছড়ে পড়ার তীব্র ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও অ্যামেলিয়া দমে যাননি, বরং অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় বিমানটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখেন।
প্যারিসের বদলে আয়ারল্যান্ডের চারণভূমিতে অবতরণ
ঝড়, কুয়াশা আর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অ্যামেলিয়া বুঝতে পারেন যে তার পক্ষে আর প্যারিস পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব নয়। তাই তিনি তার রুট কিছুটা পরিবর্তন করে যুক্তরাজ্যের দিকে এগিয়ে যান। অবশেষে ১৪ ঘণ্টা ৫৬ মিনিটের এক শ্বাসরুদ্ধকর ও ক্লান্তিহীন লড়াই শেষে ২১ মে তিনি উত্তর আয়ারল্যান্ডের ডেরি অঞ্চলের কুলমোর নামক একটি প্রত্যন্ত গ্রামের চারণভূমিতে তার বিমানটি সফলভাবে অবতরণ করান। লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা সেই শান্ত ঘাসের মাঠে যখন লাল রঙের এক অদ্ভুত যান এসে থামল, তখন স্থানীয় এক কৃষক অবাক হয়ে এগিয়ে আসেন। অ্যামেলিয়া যখন বিমানের ককপিট থেকে মাথা বের করে হালকা হেসে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি এখন কোথায় আছেন? কৃষক উত্তর দিলেন, ‘সবুজ চারণভূমিতে।’ এরপর অ্যামেলিয়া যখন জানালেন তিনি সরাসরি আমেরিকা থেকে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে এসেছেন, তখন সেই কৃষকের চোখ চড়কগাছ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
ইতিহাসের পাতায় অমর এক অনন্য অনুপ্রেরণা
আটলান্টিক জয়ের এই অবিশ্বাস্য কীর্তি রাতারাতি অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভার তাকে বিশেষ স্বর্ণপদকে ভূষিত করেন এবং আমেরিকান কংগ্রেস তাকে ‘ডিস্টিংগুইশড ফ্লাইং ক্রস’ উপাধিতে সম্মানিত করে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, অদম্য ইচ্ছা আর সাহসের কাছে আকাশের সীমানাও কোনো বাধা নয়। এই সফলতার পর তিনি নারীদের বৈমানিক পেশায় আসার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যান এবং নিজে হয়ে ওঠেন নারী স্বাধীনতার এক বৈশ্বিক প্রতীক। ১৯৩২ সালের ২১ মে আয়ারল্যান্ডের সেই চারণভূমিতে অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট যে ইতিহাস লিখেছিলেন, তা আজও কোটি কোটি মানুষকে নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলার এবং সব ধরনের প্রতিকূলতার দেয়াল ভেঙে চুরমার করার এক অন্তহীন অনুপ্রেরণা জুগিয়ে চলেছে।