সকালের অ্যালার্মটা যখন বিকট শব্দে বেজে ওঠে, তখন মন বলে আর একটুখানি ঘুমিয়ে নেই। কাজের তাগিদ আর ব্যস্ত জীবনের দাপটে প্রতিদিন আমাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিছানা ছাড়তে হয়, ছুটতে হয় যান্ত্রিক নিয়মের ছকে। কিন্তু ভাবুন তো, যদি একটা গোটা দিন এমন পাওয়া যেত যেখানে আপনাকে কোনো কাজ করতে হবে না, কাজের কোনো তাড়া থাকবে না, আর কোনো অপরাধবোধ ছাড়াই সারাদিন সোফায় কিংবা বিছানায় এলিয়ে দেওয়া যাবে শরীর? পৃথিবীর বুকে এমন একটি অদ্ভুত সুযোগ কিন্তু সত্যিই লুকিয়ে রয়েছে। কোনো অপরাধবোধ না রেখে অলস সময় কাটানোও যে জীবনের একটা বড় গুণ হতে পারে, তা ভাবলেই শরীর ও মন হালকা হয়ে যায়। আর তাই আজ ১০ আগস্ট বিশ্ব জুড়ে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব অলস দিবস’।
অলস দিনের ইতিবৃত্ত
আমাদের এই অতি-ব্যস্ত সমাজে একটানা খেটে যাওয়াকেই সাফল্যের একমাত্র উপায় বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু ইতিহাস ও বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। কোনো কাজ না করে স্রেফ অলস হয়ে অলস সময় পার করে দেওয়ার অধিকারকে সম্মানের সাথে উদ্যাপন করতে আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক অলস দিবস। বছরের এই একটি দিনে আনুষ্ঠানিকভাবে সবাইকে কোনো প্রকার কাজ না করার, কোনো সময়সূচি না মানার এবং পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। আধুনিক দুনিয়ার অতি-উৎপাদনশীলতার যে চাপ আমাদের প্রতিনিয়ত পিষে মারে, তার মুখে এক ধরনের মিষ্টি প্রতিবাদ হিসেবে আজকের দিনটি অলসদের জন্য উৎসর্গ করা হয়েছে।
আবিষ্কারের নেপথ্যে আলসেমি আর মজার ইতিহাস
এই অদ্ভুত আনন্দের দিনটির সূচনা আসলে কবে আর কারা করেছিল, তা স্পষ্ট করে জানতে ইতিহাসবিদদের বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, দিনটির সূচনাকারীদের নাম কোথাও লিখে যাওয়া হয়নি। বলা হয়ে থাকে, যারা এই অনন্য চিন্তা মাথায় এনেছিলেন, তারা এর ইতিহাস লিখে রাখার মতো পরিশ্রম করতেই অলসতা বোধ করেছিলেন! তবে নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্ব অলস দিবসের ধারণাটি প্রথম ডালপালা মেলে কলম্বিয়ার ইতাজুই শহরে। ১৯৮৪ সালে টানা আট দিনের কোলাহলপূর্ণ বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক উৎসবের পর সেখানে কার্লোস মনতোয়া নামের এক বাসিন্দা চিন্তা করেন, উৎসবের শেষ দিনে কোনো কাজ না করে সবার বিশ্রাম নেওয়া উচিত। সেই ভাবনা থেকেই বিশ্বব্যাপী এই দিবসের চল শুরু হয়, যা ২০০০ সালের পর আরও ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
বিশ্রাম আর অলসতার বিজ্ঞান
অলসতাকে সমাজ চিরকাল একটা নেতিবাচক চোখে দেখে এলেও স্নায়ুবিজ্ঞানীরা কিন্তু এর এক দারুণ ইতিবাচক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন স্রেফ কোনো কাজ না করে চুপচাপ শুয়ে-বসে থাকে, তখন মস্তিষ্কের এক বিশেষ অংশ সচল হয়ে ওঠে। একে বলা হয় নিউরনের বিশ্রাম অবস্থা। যখন আমাদের মাথা একদম খালি থাকে, তখনই নতুন নতুন সৃজনশীল ভাবনার জন্ম হয়। ইতিহাস সাক্ষী, আইজাক নিউটন যখন আপেল গাছের নিচে অলসভাবে বসে ছিলেন, তখনই মহাকর্ষের সূত্র আবিষ্কার হয়েছিল। একটানা কাজের ক্লান্তি ও মানসিক চাপ মানুষকে শেষ করে দেয়, আর মাঝেমধ্যে অলসতা উদযাপনের মাধ্যমে শরীর ও মন নতুন করে শক্তি ফিরে পায়।
বিছানা ছেড়ে বের না হওয়ার মিষ্টি প্রতিশ্রুতি
জীবনের ইঁদুর দৌড়ে আমরা এত দ্রুত ছুটছি যে একটু থেমে জিরিয়ে নেওয়ার কথা ভুলেই গেছি। তাই আজকের দিনে নিজের ভেতরের সব ধরণের কাজ করার তাগিদ একপাশে সরিয়ে রাখুন। ফোন দূরে সরিয়ে রেখে, প্রিয় পোষা প্রাণী বা বালিশ জড়িয়ে ধরে স্রেফ অলস সময় কাটান। কাজের চাকা তো সারা বছর ঘুরবেই, কিন্তু একটি দিন নিজের মন আর শরীরকে কোনো দায়বদ্ধতা ছাড়া ছুটি দেওয়ার চেয়ে বড় উপহার আর কিছুই হতে পারে না। আলসেমির এই ভেজা সন্ধ্যায় চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আজ নিজের সাথেই অলস চুক্তিতে আবদ্ধ হোন আজ আর কোনো কাজ নয়।