সানাইয়ের মধুর সুর, রঙিন আলোকসজ্জা আর চারপাশের মানুষের কোলাহলে যখন একটি ঘর মুখরিত হয়ে ওঠে, ঠিক তখনই যেন শুভ পরিণয়ের আগমন ঘটে। একটি বিবাহ বন্ধন মানেই তো আনন্দ আর রীতিনীতির মহাসমারোহ। আমাদের দেশে তো এই আয়োজন মানেই ধুমধাম করে গায়ে হলুদ, জাকজমকপূর্ণ মূল বিয়ে এবং সবশেষে বউভাতের ভূরিভোজ। ইদানীং আবার যোগ হয়েছে বিয়ের আগের বিশেষ আলোকচিত্র ধারণের আয়োজন, রঙিন মেহেদি সন্ধ্যা কিংবা পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে কয়েক দিনব্যাপী উৎসবের নানা অনুষঙ্গ। তবে আমাদের এই সুপরিচিত চেনা আনন্দের বাইরেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানচিত্রে চোখ রাখলে এমন কিছু বিবাহের আচার দেখা যায়, যা শুনলে যেকোনো মানুষের চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। শত শত বছর ধরে নিজেদের সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে মানুষ যে সব বিচিত্র সব প্রথা পালন করে আসছে, তার পেছনের গল্পগুলো একই সাথে বেশ তাজ্জব করার মতো এবং দারুণ কৌতূহলোদ্দীপক।
বর কিংবা কনেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া
আমাদের চেনা জগতে বিবাহের প্রস্তাব সাধারণত অত্যন্ত সম্মান ও সম্মতির সাথে দেওয়া হলেও কিছু সংস্কৃতিতে এর রূপ ছিল একদমই রোমাঞ্চকর ও ভীতিকর। মধ্য এশিয়ার কিরগিজস্তানে এক সময় এমন এক ভয়ঙ্কর প্রথার প্রচলন ছিল, যেখানে কোনো পুরুষ তার পছন্দের নারীকে সরাসরি অপহরণ করে নিয়ে আসত এবং বিবাহের জন্য বাধ্য করত। নারীটির সেই সম্পর্কে কোনো সম্মতি থাকুক কিংবা না থাকুক, তাকে এই বন্দিদশা মেনে নিতে হতো, যদিও আধুনিক আইনি ব্যবস্থায় বর্তমানে এই চরম বিতর্কিত প্রথাটি সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, প্রতিবেশী ভারতের বিহারের কিছু গ্রামীণ এলাকায় চিত্রটি একদম উল্টো। সেখানে কনের বাড়ির লোকজন পছন্দসই এবং যোগ্য কোনো যুবককে সুযোগ বুঝে অপহরণ করে নিয়ে আসে। এরপর সেই অসহায় যুবককে নিজের কন্যা বা বোনের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে বাধ্য করা হয় এবং অবশেষে সেই যুবতীকে নিয়ে তাকে সংসার পাততে হয়।
থালাবাসন ভেঙে আনন্দ আর গৃহস্থালির দায়িত্ব
বিবাহের পর নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করার বদলে যদি ঘরের বাসনকোসন ভাঙচুর করা হয়, তবে তা যে কারো কাছে চরম এক বিশৃঙ্খলা মনে হতে পারে। কিন্তু জার্মানিতে এই কাণ্ডটিই ঘটে অত্যন্ত আনন্দের সাথে এবং দম্পতির শুভকামনা জানানোর অনন্য এক মাধ্যম হিসেবে। সেখানে বিবাহ সম্পাদন হওয়ার পর আমন্ত্রিত অতিথিরা যখন নববিবাহিত দম্পতির বাসভবনে উপস্থিত হন, তখন তারা সাথে করে নিয়ে আসা মাটির পাত্র ও রান্নাঘরের প্লেট-বাসন মেঝেময় আছাড় দিয়ে ভেঙে চুরমার করে ফেলেন। তাদের লোক বিশ্বাস বলে, এই প্রথা নবদম্পতির জীবনে চরম সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধি বয়ে আনে। তবে এই রীতির আসল চমক লুকিয়ে রয়েছে এর ঠিক পরপরই; অতিথিরা ঘর ছেড়ে প্রস্থান করার পর গৃহের সেই অগুনতি ভাঙা টুকরো নবদম্পতিকে একদম একা হাতে পরিষ্কার করতে হয়। এর পেছনের আসল দর্শন হলো, জীবনের কঠিন সময়ে কীভাবে একে অপরের হাত ধরে পাশে থাকতে হয় এবং গৃহস্থালির দায়িত্ব যৌথভাবে ভাগ করে টিমওয়ার্ক গড়ে তুলতে হয়, তার বাস্তব শিক্ষা দেওয়া।
করাত দিয়ে কাঠ কেটে সংসারের যাত্রা শুরু
সংসারের দুর্গম পথ অতিক্রম করতে হলে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সহযোগিতা যে কতটা জরুরি, তা বোঝাতে অস্ট্রিয়ায় রয়েছে আরও এক মজাদার ও পরিশ্রমী সামাজিক প্রথা। সাধারণত বিবাহের নৈশভোজ বা বড় আপ্যায়ন অনুষ্ঠানে অতিথিদের সামনে নববিবাহিত দম্পতিকে এনে হাজির করা হয় একটি বিশাল কাঠের গুঁড়ো বা ভারী লাঠির সামনে। এরপর তাদের দুই হাতে তুলে দেওয়া হয় একটি দীর্ঘ করাত। বর ও কনেকে একসাথে মিলে টানাটানির মাধ্যমে সেই কাঠের লাঠিটি সমান দুই ভাগে কেটে ফেলতে হয়। উৎসবের আমেজে এই কাজটির উদ্দেশ্য হলো কাঠ কাটার মতো দৈহিক পরিশ্রমের মাধ্যমে নবদম্পতিকে এটি অনুধাবন করানো যে, বৈবাহিক জীবন কখনোই একা চালনা করা সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে যেকোনো বড় চ্যালেঞ্জ বা প্রতিকূল পরিস্থিতি আসুক না কেন, তারা দুজন মিলে ঠিক এভাবেই ঐক্যবদ্ধভাবে সব বাধা কেটে সামনে এগিয়ে যাবে।
শরীরে কালি মেখে অপমান সহ্য করার শিক্ষা
বিবাহিত জীবন মানেই আনন্দময় কোনো গল্প নয়, এতে লুকিয়ে থাকে বহু কষ্ট ও ধৈর্যের পরীক্ষা; স্কটল্যান্ডের প্রাচীন এক রীতিনীতি যেন এই সত্যটিকেই মনে করিয়ে দেয় কঠোরভাবে। সেখানে বিবাহের মূল আনুষ্ঠানিকতার ঠিক আগে বর ও কনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা মিলে তাদের ওপর এক রীতিমতো আক্রমণ চালিয়ে বসে। বর-কনের মুখে ও শরীরে লেপে দেওয়া হয় আলকাতরার মতো বিশ্রী কালো রং, আর তার ওপর ঢেলে দেওয়া হয় আটা, ময়দা ও পচা তরল জাতীয় নানা রকমের ময়লা জিনিস। এরপর সেই অবস্থাতেই তাদের অপমানিত ও হাস্যকর বানিয়ে সবার সামনে ঘুরানো হয়। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই অদ্ভুত সংস্কৃতির মূল বিশ্বাসটি হলো, বিবাহিত জীবন অত্যন্ত কঠিন এবং সেখানে নানা অপমান ও বাধা আসতে পারে। যদি বর ও কনে এই চরম অপমানজনক পরিস্থিতি একসাথে হাসিমুখে সহ্য করে টিকে থাকতে পারে, তবে ভবিষ্যতে জীবনের যেকোনো কঠিনতম ঝড়ঝাপটা কিংবা প্রতিকূল পরিস্থিতি তারা অতি সহজেই মুখোমুখি হয়ে পার করে দিতে পারবে।
বরের জুতো চুরি ও কনের কান্না
আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে একটি প্রচলিত ও জনপ্রিয় প্রথা রয়েছে, যা ‘জুতা চুরাই’ নামে পরিচিত। বিবাহের মূল আচার চলাকালীন কনের বোনেরা অর্থাৎ শ্যালিকারা চতুরতার সাথে বরের জুতো চুরি করে লুকিয়ে ফেলে। পরবর্তীতে সেই জুতো ফেরত পাওয়ার জন্য বরকে বেশ মোটা অঙ্কের অর্থ বা উপহার তুলে দিতে হয় শ্যালিকাদের হাতে। অন্যদিকে চীনের তুজিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে রয়েছে একেবারেই ভিন্ন এক রীতি। সেখানে বিবাহের প্রায় এক মাস আগে থেকেই কনেকে প্রতিদিন নিয়ম করে এক ঘণ্টা করে কাঁদতে হয়। একা নয়, কিছুদিন পর তার সাথে যোগ দেন মা, ঠাকুমা এবং পরিবারের অন্যান্য নারী সদস্যরাও। কান্নাকে সেখানে দুঃখের প্রতীক নয়, বরং আনন্দের প্রকাশ এবং হবু বরের প্রতি গভীর ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা হয়।
বরের পায়ে বেতের বাড়ি ও গাছের সাথে বিয়ে
দক্ষিণ কোরিয়ায় বরকে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে এক চরম ও মজাদার পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। সেখানে বরের বন্ধুরা তার জুতো খুলে পা জোড়া শক্ত করে বাঁধে। এরপর শুকনো মাছ বা কাঠের বেত দিয়ে বরের পায়ের তলায় সজোরে মারতে থাকে। বিশ্বাস করা হয়, এই প্রথা বরকে তার বৈবাহিক জীবনের প্রথম রাতের জন্য মানসিকভাবে শক্তিশালী ও চাঙ্গা করে তোলে। অন্যদিকে ভারতের কিছু অঞ্চলে মঙ্গল দোষ বা জ্যোতিষশাস্ত্রীয় অশুভ প্রভাব কাটাতে কনেকে মানুষের সাথে বিবাহের আগে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি কলার গাছ বা অশ্বত্থ গাছের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়। বিশ্বাস করা হয়, এর ফলে নারীটির ওপর থাকা যাবতীয় অশুভ নজর বা দুর্ভাগ্য গাছের ওপর বর্তায় এবং পরবর্তীতে বাস্তব জীবনে বর কোনো বিপদের সম্মুখীন হয় না।
মাটিতে পা না রাখা ও সুপারি কুপিয়ে বিয়ে
পশ্চিম আফ্রিকার নিরক্ষীয় গিনি বা ক্যামেরুনের কিছু উপজাতি এবং রোমানিয়া বা আজারবাইজানের কিছু গ্রামীণ সংস্কৃতিতে বিয়ের দিনে কনের পা মাটিতে স্পর্শ করতে দেওয়া হয় না। ঘর থেকে বের হওয়া থেকে শুরু করে মূল অনুষ্ঠানস্থল পর্যন্ত কনেকে হয় বরের স্বজনেরা কাঁধে তুলে নিয়ে যান, নয়তো বিশেষ পিঁড়িতে বসিয়ে বহন করা হয়। তাদের লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, বিবাহের শুভ দিনে কনের পা মাটিতে লাগলে মাটির অশুভ আত্মা তার ভাগ্যে ভর করতে পারে। অন্যদিকে আফ্রিকার আরেক উপজাতীয় সংস্কৃতিতে কনেকে কতটুকু সহ্যক্ষমতা ও ধৈর্যের অধিকারী হতে হবে, তা পরীক্ষা করার জন্য বিবাহের পূর্ব মুহূর্তে কনের পরিবার বরকে প্রকাশ্যে গালিগালাজ ও অপমান করে, আর বরকে তা চুপচাপ সহ্য করে হাসিমুখে গ্রহণ করতে হয়।