গভীর রাতে অন্ধকার ঘরে একা বসে আছেন, হঠাৎ অনুভব করলেন জানালার বাইরে থেকে দুটি প্রকাণ্ড গোল গোল চোখ একদৃষ্টিতে আপনার দিকে তাকিয়ে আছে! বুক ধড়ফড় করে ওঠার আগেই যদি দেখেন সেটি কোনো অশরীরী কিছু নয়, বরং নিশাচর এক পেঁচা,তবে চশমাটা আর একটু ভালো করে মুছে নিন। ৪ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক পেঁচা সচেতনতা দিবস বা ‘ইন্টারন্যাশনাল আউল অ্যাওয়ারনেস ডে’। রহস্যময় রাত আর নিশাচর জীবনের কারণে যুগ যুগ ধরে এই পাখিটিকে নিয়ে মানুষের মনে কত রকমের অদ্ভুত ভয় আর অহেতুক কুসংস্কার জমা হয়ে আছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। অথচ একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, রহস্যের চাদর সরিয়ে এই ডানাওয়ালা প্রাণীটি প্রকৃতির কত বড় নীরব বন্ধু হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা লোকগাথা আর ভুল ধারণা ভেঙে এই পরিবেশবান্ধব পাখিদের বাঁচিয়ে রাখার তাগিদেই বিশ্বব্যাপী এই বিশেষ দিনটির সূচনা।
প্রকৃতির অবিশ্বাস্য এক শিকারি যার ওড়ার কোনো শব্দ নেই
প্রকৃতির তৈরি সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রকৌশলগুলোর একটি হলো এই পেঁচা। সারা পৃথিবীতে প্রায় আড়াইশটিরও বেশি প্রজাতির পেঁচা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এদের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হলো, এরা আকাশে ডানা ঝাপটে ওড়ার সময় একটুও শব্দ তৈরি করে না, ফলে শিকার টের পাওয়ার আগেই এরা নিঃশব্দে নেমে আসতে পারে। এদের চোখ দুটি কিন্তু আমাদের মতো একদম স্থির থাকে, যা মাথার ভেতরে ঘোরানো যায় না। এই ঘাটতি মেটাতেই প্রকৃতি এদের ঘাড় প্রায় দুইশত সত্তুর ডিগ্রি পর্যন্ত ঘোরাতে সক্ষম করেছে, যা দেখে সাধারণ মানুষের চোখ ছানাবড়া হওয়াটা একেবারেই স্বাভাবিক। দৃষ্টিশক্তির পাশাপাশি এদের শ্রবণশক্তিও মারাত্মক নিখুঁত, যার সাহায্যে ঘাসের ভেতরে চলাফেরা করা ছোট্ট কোনো প্রাণীর পদশব্দও এরা বহুদূর থেকে ধরে ফেলতে পারে।
কৃষকের বন্ধু যে একাই হাজারো ইঁদুর সাফ করে দেয়
গ্রামাঞ্চলে কিংবা লোকালয়ে অনেকেই পেঁচাকে অমঙ্গলের প্রতীক বলে মনে করেন, যা সম্পূর্ণ কাল্পনিক এবং ভুল ধারণা। বাস্তবে আমাদের কৃষি এবং পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে পেঁচার অবদান অপরিসীম। পেঁচাকে বলা হয় প্রকৃতির সেরা ইঁদুর দমনকারী। কেবল একজোড়া লক্ষ্মীপেঁচা পুরো প্রজনন মৌসুমে তিন হাজারের বেশি ক্ষতিকর ইঁদুর ও পোকা-মাকড় খেয়ে সাবাড় করে দেয়। যদি এরা না থাকত, তবে ফসলের মাঠে ইঁদুরের উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠত এবং কৃষকদের মারাত্মক লোকসানের মুখ দেখতে হতো। বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার না করেই কীভাবে ফসল রক্ষা করা যায়, পেঁচা আমাদের প্রতিদিন সেই সহজ শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে।
এই প্রহরীদের বাঁচাতে হবে
প্রকৃতির এত উপকার করা সত্ত্বেও বর্তমানে মানুষের কারণে এই অনন্য সুন্দর প্রাণীটি আজ মারাত্মক অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। নির্বিচারে গাছপালা কেটে বনভূমি উজাড় করা, ফসলের মাঠে ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশক ছিটানো এবং অহেতুক কুসংস্কারের বশে পেঁচা নিধনের ফলে এদের সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে কমে আসছে। এই আন্তর্জাতিক দিবসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পরিবেশের নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখতে নিশাচর এই প্রহরীদের বাঁচিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। অহেতুক ভয় না পেয়ে আসুন এদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করি, যেন আমাদের রাতের নীরব আকাশে এই চোখ মেলে থাকা ডানাওয়ালা বন্ধুরা চিরকাল সগৌরবে জেগে থাকতে পারে।