বিশ্ব আলোকচিত্রের ইতিহাসে যে কজন কালজয়ী মানুষ সাধারণ সময়কে অসাধারণ শিল্পে রূপান্তর করেছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ফরাসি শিল্পী অঁরি কার্তিয়ে-ব্রেসোঁ। ১৯০৮ সালের ২২ আগস্ট ফ্রান্সের শঁতেলুপ-আঁ-ব্রি শহরে জন্মগ্রহণ করা এই মহান ব্যক্তিত্ব ২০০৪ সালের ৩ আগস্ট শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ তার মৃত্যুবার্ষিকীতে বিশ্বজুড়ে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হচ্ছে আধুনিক ফটোজার্নালিজম ও স্ট্রিট ফটোগ্রাফির এই পথপ্রদর্শককে। শৈশবে চিত্রকলার প্রতি গভীর অনুরাগ থাকলেও পরবর্তীতে ক্যামেরাকেই তিনি বানিয়ে নেন নিজের প্রধান মাধ্যম। ছোট আকারের ৩৫ মিলিমিটার লাইকা ক্যামেরা হাতে নিয়ে রাজপথ, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনধারা এবং জীবনের অকৃত্রিম মুহূর্তগুলোকে তিনি যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা আলোকচিত্রের জগতে নতুন দিগন্ত রচনা করেছিল। কোনো কৃত্রিম আলোকসজ্জা কিংবা সাজানো মঞ্চায়ন ছাড়াই বাস্তব জীবনের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে তার উদ্ভাবনী দৃষ্টি বিশ্ববাসীকে মুগ্ধ করেছিল।
কার্তিয়ে-ব্রেসোঁর কাজের মূল ভিত্তি ছিল তার বিশ্ববিখ্যাত দর্শন, যা ‘সিদ্ধান্তমূলক মুহূর্ত’ বা ‘ডিসাইসিভ মোমেন্ট’ নামে সুপরিচিত। তিনি বিশ্বাস করতেন, জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত মুহূর্তকে নিখুঁতভাবে ফ্রেমে বন্দি করার জন্য প্রয়োজন সময়, অনুভূতি ও জ্যামিতিক নকশার এক অবিশ্বাস্য মেলবন্ধন। ক্যামেরা চালনার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন নিঃশব্দ পর্যবেক্ষক, যিনি নিখুঁত চাতুর্যের সাথে জীবনের সবচেয়ে সূক্ষ্ম আবেগকে লেন্সে আটকে ফেলতেন। ১৯৪৭ সালে বিখ্যাত আলোকচিত্রী রবার্ট ক্যাপা এবং আরও কয়েকজন গুণী সহশিল্পীর সাথে মিলে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্বখ্যাত ছবি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘ম্যাগনাম ফটোস’। এর মাধ্যমে আলোকচিত্র সাংবাদিকতা এক স্বাধীন ও নতুন উচ্চতা লাভ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভারত ও চীনের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনসহ বিংশ শতাব্দীর বহু ঐতিহাসিক ঘটনা তিনি বিশ্ববাসীর সামনে নিয়ে এসেছিলেন নিজের ক্যামেরার চোখ দিয়ে।
শিল্পকলা, মানবিক চেতনা এবং ভিজ্যুয়াল মাধ্যমের মেলবন্ধনে কার্তিয়ে-ব্রেসোঁ তৈরি করেছিলেন আলোকচিত্রের এক চিরন্তন ভাষা। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইউরোপ, এশিয়া এবং আমেরিকার বিভিন্ন দেশ ঘুরে তিনি নথিভুক্ত করেছেন মানব সভ্যতার নানান রূপ। মানুষের স্বাভাবিক চালচলন, আলো ও ছায়ার নিখুঁত খেলা এবং ছবির সুষম বিন্যাস তাকে অনন্য স্থান এনে দিয়েছে। পরবর্তী জীবনে তিনি পুনরায় চিত্রাঙ্কনের দিকে মনোনিবেশ করলেও, একজন পথিকৃৎ হিসেবে আলোকচিত্রের জগতে তার রেখে যাওয়া ছাপ চির অমলিন। আজকের দিনেও পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে নতুন ও অভিজ্ঞ আলো কুশলীদের কাছে অঁরি কার্তিয়ে-ব্রেসোঁ এক অফুরন্ত প্রেরণার উৎস এবং ক্যামেরার পেছনের এক অবিসংবাদিত কারিগর।