টানা বর্ষণে যখন স্বাভাবিক জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে, তখনও কর্মজীবী মানুষকে বাধ্য হয়েই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে গন্তব্যে ছুটতে হয়। আর এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যাতায়াতের জন্য অনেকেরই প্রধান ভরসা মোটরসাইকেল। তবে বৃষ্টির মধ্যে দীর্ঘসময় বাইক চালানো কি ইঞ্জিনের কোনো ক্ষতি করে? কিংবা ভেজা রাস্তায় একটানা কতক্ষণ রাইড করা নিরাপদ, তা নিয়ে অনেকেই চিন্তায় পড়েন।
আসুন জেনে নেই, বর্ষায় নিজের নিরাপত্তা বজায় রেখে কীভাবে বাইকের ইঞ্জিন ভালো রাখবেন…
ইঞ্জিন ও রাইডিংয়ের সময়সীমা
বৃষ্টির মধ্যে বাইক চালানোর সময় যদি গতিসীমা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, বিশেষ করে বাইকের সর্বোচ্চ গতির (Top Speed) ৭০ শতাংশের মধ্যে গতি রাখা হয়, তবে ইঞ্জিনের বড় কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। তবে বৃষ্টির দিনে ইঞ্জিনের সক্ষমতার চেয়েও বেশি নজর দেওয়া উচিত রাইডারের নিজস্ব সচেতনতা এবং বাইকের ইলেকট্রিক পার্টসের সুরক্ষার ওপর।
টানা বৃষ্টিতে রাইড করার সময় জরুরি সতর্কতা
ইঞ্জিন ও ইলেকট্রিক পার্টসের সুরক্ষা: বৃষ্টির পানি যদি বাইকের স্পার্ক প্লাগ বা কোনো বৈদ্যুতিক সংযোগে ঢুকে যায়, তবে বাইক হুট করে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে জোর করে বারবার স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। এতে ইঞ্জিনের ক্ষতি হতে পারে। বরং বাইকটি নিরাপদ স্থানে দাঁড় করিয়ে স্পার্ক প্লাগ ও এর আশপাশের অংশ শুকনো কাপড় দিয়ে ভালো করে মুছে তারপর স্টার্ট দিন।
রাইডারের ক্লান্তি ও বিরতি: মেকানিক্যাল দিক থেকে ইঞ্জিনের হয়তো দীর্ঘক্ষণ চলার ক্ষমতা আছে, কিন্তু ঝড়-বৃষ্টির প্রতিকূল আবহাওয়ায় একটানা বাইক চালানো রাইডারের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে ভীষণ ক্লান্তিকর। মনোযোগ সামান্য বিঘ্নিত হলেও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই নিরাপত্তার স্বার্থে একটানা ১০০ কিলোমিটারের বেশি রাইড না করে মাঝে বিরতি নেওয়া উচিত।
গতি ও ব্রেকিং নিয়ন্ত্রণ: ভেজা বা কর্দমাক্ত রাস্তা মারাত্মক পিচ্ছিল থাকে। তাই সাধারণ সময়ের চেয়ে গতি অনেকটাই কমিয়ে আনুন, বিশেষ করে মোড় বা টার্নিং নেওয়ার সময়। সামনের গাড়ি থেকে পর্যাপ্ত দূরত্ব বজায় রাখুন, কারণ বৃষ্টিতে ব্রেক ধরলে বাইক থামতে সাধারণ সময়ের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দূরত্ব বা বেশি সময়ের প্রয়োজন হয়।
বর্ষাকালে বাইকের দীর্ঘস্থায়ী যত্নে করণীয়
বৃষ্টির পানি এবং রাস্তার কাদা-বালি বাইকের মেটাল পার্টস বা চেইনে দ্রুত মরিচা ফেলে দিতে পারে। তাই এই সময়ে বাইক সচল রাখতে নিচের টিপসগুলো মেনে চলুন:
নিয়মিত পরিষ্কার করা: বৃষ্টিতে ভিজে রাইড শেষ করার পর অলসতা না করে পরিষ্কার পানি দিয়ে বাইকের কাদা ও ময়লা ধুয়ে ফেলুন। এরপর একটি শুকনো সুতি কাপড় দিয়ে পুরো বাইকটি ভালোভাবে মুছে নিন যেন কোথাও পানি জমে না থাকে।
চেইনের যত্ন (লুব্রিকেশন): বৃষ্টির পানিতে চেইনের লুব্রিক্যান্ট খুব দ্রুত ধুয়ে যায়। চেইন শুষ্ক হয়ে গেলে তা ইঞ্জিন পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলে এবং দ্রুত ক্ষয় হয়। তাই নিয়মিত চেইন পরিষ্কার করে চেইন লুব্রিক্যান্ট বা গিয়ার অয়েল ব্যবহার করুন।
ব্রেক সিস্টেম পরীক্ষা: বর্ষার দিনে ব্রেকিং দূরত্ব বেড়ে যায়, তাই ব্রেক প্যাড ও ব্রেক অয়েলের কার্যকারিতা ঠিক আছে কিনা তা নিয়মিত পরীক্ষা করুন। ক্ষয়ে যাওয়া ব্রেক প্যাড দ্রুত বদলে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
হেলমেটের গ্লাস বা ভিজর: বৃষ্টির ফোঁটায় হেলমেটের গ্লাস ঘোলা হয়ে দৃষ্টিসীমা কমে আসে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই সমস্যা এড়াতে হেলমেটের গ্লাসে অ্যান্টি-ফগ (Anti-fog) স্প্রে ব্যবহার করতে পারেন অথবা রাইডিংয়ের সময় গ্লাস পরিষ্কার রাখুন।
উল্লেখ্য, প্রকৃতির ওপর আমাদের হাত নেই, তবে সঠিক প্রস্তুতি ও সতর্কতা অবশ্যই আমাদের নিয়ন্ত্রণে। বর্ষার দিনে তাড়াহুড়ো না করে নিজের শারীরিক সক্ষমতা এবং রাস্তার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে রাইড করুন।