Tuesday 18 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ২ বছর / রাজশাহীতে ৩০ মামলার ২১টির তদন্ত শেষ হলেও বিচারপ্রক্রিয়ায় ধীরগতি

শামীম সবুজ, ডিস্ট্রিক্ট করেসপনডেন্ট
১৮ আগস্ট ২০২৬ ২৩:৪৮ | আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০২৬ ২৩:৫৫

রাজশাহী: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ে হামলা, গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রাজশাহীতে দায়ের হয়েছে ৩০ মামলা। দুই বছর শেষে দেখা গেছে, মামলাগুলোর তদন্তে ধীরগতি, সাক্ষীর সংকট, পর্যাপ্ত ভিডিও ফুটেজ ও ফরেনসিক আলামত সংগ্রহের জটিলতা এবং আদালতে বিচারকের স্বল্পতার কারণে বিচারপ্রক্রিয়াও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। নিহতদের স্বজন, আহত জুলাই যোদ্ধা ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বিচার বিলম্বিত হওয়া মানেই বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া। তবে পুলিশের দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই মামলাগুলোর তদন্ত ও চার্জশিট দাখিল করা হচ্ছে।

আলুপট্টির সংঘর্ষ, সাকিব ও আলী রায়হান নিহত

বিজ্ঞাপন

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা রাজশাহী নগরীর আলুপট্টি এলাকায় পৌঁছালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশের উপস্থিতিতে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের অভিযোগ ওঠে। পরে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পালটাপালটি সংঘর্ষে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

সেদিনের সহিংসতায় বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাকিব আঞ্জুম নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনি একটি বাড়িতে আশ্রয় নিলেও সেখানে গিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।

একই ঘটনায় গুরুতর আহত হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আলী রায়হান। কয়েক দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ৮ আগস্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

এই দুই শিক্ষার্থীর হত্যাকাণ্ড রাজশাহীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে ওঠে। তাঁদের হত্যা মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে।

‘দুই বছরেও বিচার দেখতে পাইনি’

সাকিব আঞ্জুমের মৃত্যুর এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘৫ আগস্ট দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সাকিব আমাদের বাসায় আশ্রয় নেয়। বাসায় ঢুকেই সে এক গ্লাস পানি চেয়েছিল। পানি পান করার পরই সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তার শেষ মুহূর্ত আমি নিজের চোখে দেখেছি। সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য এখনো ভুলতে পারিনি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, দুই বছর পার হয়ে গেলেও এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার দেখতে পাইনি।’

তিনি বলেন, ‘যারা এই হত্যার সঙ্গে জড়িত, তাদের অনেকেই এখনো প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি শুধু সাকিব নয়, জুলাই আন্দোলনে প্রাণ হারানো প্রত্যেক শহিদের হত্যার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত বিচার চাই।’

রাজশাহীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে ফিনল্যান্ডে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সাকিব। তবে সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।

সাকিবের মা রোকেয়া খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলেকে তো আর কোনোদিন ফিরে পাব না। কিন্তু যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে, তাদের বিচার হলে অন্তত একজন মা হিসেবে কিছুটা শান্তি পাব। দুই বছর ধরে শুধু অপেক্ষা করছি। রাষ্ট্র যদি শহিদ পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চায়, তাহলে সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা হবে খুনিদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা।’

সাকিবের বাবা মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম সরকার পরিবর্তনের পর অন্তত বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত এগোবে। কিন্তু দুই বছর পার হলেও মামলার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না। আমরা কোনো প্রতিশোধ চাই না, শুধু আইনের মাধ্যমে সঠিক বিচার চাই।’

৩০ মামলার ২১টির তদন্ত প্রতিবেদন

আরএমপি কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির জানান, রাজশাহীতে জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক ৩০ মামলার মধ্যে ২১টির তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। আরও দুটি মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি। রাজশাহীতে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই মামলাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। আরএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম)-এর নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম নিয়মিতভাবে তদন্ত কার্যক্রম তদারকি করছে।’

বাকি মামলাগুলোর তদন্তও দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে সেগুলোর প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা সম্ভব হবে।

পুলিশ কমিশনারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত যেসব মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে, সেগুলোতে প্রায় আড়াই হাজার আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৬ শতাধিক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পলাতকদের গ্রেপ্তারে অভিযানও চলছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা কারও বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, কেবল তথ্য-প্রমাণ, ভিডিও ফুটেজ, ডিজিটাল আলামত ও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিচ্ছি। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেটিও আমরা সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি।’

তদন্তে কেন সময় লাগছে

পুলিশ সূত্র বলছে, মামলাগুলোর তদন্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর সংকট। নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেকেই সাক্ষ্য দিতে অনীহা দেখাচ্ছেন। পাশাপাশি পুরোনো ঘটনার ভিডিও ফুটেজ, ডিজিটাল আলামত ও ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ এবং যাচাই করতেও সময় লাগছে।

আরএমপির মুখপাত্র ও উপপুলিশ কমিশনার মো. গাজিউর রহমান বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ও ভিডিও ফুটেজে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, কেবল তাদেরই চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি জানান, পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে আরএমপি শহিদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।

বিচারক সংকটেও বিলম্ব

তদন্ত শেষে চার্জশিট আদালতে জমা পড়লেও বিচারপ্রক্রিয়ায় গতি আসেনি সব মামলায়। এর অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বিচারক সংকট।

রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আলী আশরাফ মাসুম বলেন, মহানগর দায়রা জজ আদালতের বেশ কয়েকটি বিচারিক পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় বিচারিক কার্যক্রম কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে।

তবে বর্তমানে মামলাগুলোর কার্যতালিকা অনুযায়ী শুনানি নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিচারাধীন মামলাগুলোর কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা করছেন।

দ্রুত বিচার দাবি জুলাই যোদ্ধাদের

জুলাই আন্দোলনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সমন্বয়ক মেহেদী সজীব বলেন, ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগকে প্রতিরোধের পর আন্দোলনে নতুন গতি আসে। পরে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে যুক্ত হন। শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও এতে সংহতি প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, ‘সেই আন্দোলনে অনেকেই জীবন দিয়েছেন, অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হলে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। বিচার বিলম্বিত হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও একটি ভুল বার্তা যাবে।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর