ঢাকা: পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের একীভূতকরণ কার্যক্রম এগিয়ে নিতে নিয়োগ দেওয়া প্রশাসক ও প্রশাসক টিমের কার্যক্রম পুরোপুরি শেষ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বশেষ গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে প্রশাসক প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের কোনোটিতেই এখন আর বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো প্রশাসক বা প্রতিনিধি নেই।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), চেয়ারম্যান ও স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের পর একই ব্যাংকে প্রশাসক টিম রাখলে দ্বৈত শাসনের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছিল। এ কারণে ধাপে ধাপে প্রশাসকদের প্রত্যাহার করা হয়েছে।
আরিফ হোসেন খান বলেন, পাঁচটি ব্যাংকের একীভূতকরণ কার্যক্রম এগিয়ে নিতে শুরুতে প্রতিটি ব্যাংকে একজন প্রশাসকের নেতৃত্বে প্রশাসক টিম নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ও মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ এবং পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়েছে। পর্ষদের চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হয়েছেন।
তিনি বলেন, প্রথম ধাপে এক্সিম ব্যাংক থেকে প্রশাসক টিম প্রত্যাহার করা হয়। এরপর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল) থেকে প্রশাসক প্রত্যাহার করা হয়। সর্বশেষ গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক থেকেও প্রশাসক প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এখন এসব ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো প্রতিনিধি নেই উল্লেখ করে মুখপাত্র বলেন, নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ ব্যাংক পরিচালনা করবে। ব্যাংকগুলোকে যে উদ্দেশ্যে একীভূত করা হয়েছে, সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নেই এখন গুরুত্ব দেওয়া হবে।
আরিফ হোসেন খান বলেন, পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষা দেওয়া। এ জন্য সরকার এসব ব্যাংকের মালিকানা গ্রহণ করে এবং প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দেয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার প্রাথমিকভাবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য উৎস মিলিয়ে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা দিয়ে ব্যাংকটির কার্যক্রম শুরু করেছে। এই অর্থের একটি অংশ ব্যবহার করে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের চাহিদার কিছুটা পূরণ করা সম্ভব হয়েছে।
তবে আমানতকারীদের চাহিদার তুলনায় অর্থের জোগান অপ্রতুল ছিল বলেও স্বীকার করেন তিনি। তার মতে, এর মধ্যেও সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে—ব্যাংকটির মালিক এখন রাষ্ট্র। ফলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অধীনে জনগণের আমানত সুরক্ষিত থাকবে—এই আস্থা ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, আগে এসব ব্যাংকের শাখায় আমানতকারীদের টাকা না পাওয়াকে কেন্দ্র করে বচসা ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটত। এখন সে ধরনের পরিস্থিতি আর দেখা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, শুরুতে ঘোষিত স্কিম অনুযায়ী আমানতকারীদের কিছু অর্থ দেওয়া হয়েছে। এখন ব্যাংকটি পূর্ণাঙ্গভাবে স্বাধীনভাবে কার্যক্রম শুরু করলে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বাড়বে এবং মুনাফা অর্জিত হবে। সেই মুনাফার মাধ্যমে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের বাকি চাহিদা ধীরে ধীরে পূরণ করা সম্ভব হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
তারল্য সংকটের কারণে শুরুতে সীমিত পরিসরে আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবে মানবিক বিষয় বিবেচনায় বিশেষ প্রয়োজনের ক্ষেত্রে এই সুযোগ বাড়ানো হয়েছে।
আরিফ হোসেন খান বলেন, অনেক আমানতকারী গুরুতর অসুস্থ। কারও কিডনি ডায়ালাইসিস চলছে, আবার কেউ ক্যানসারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি নিচ্ছেন। ব্যাংকে টাকা থাকা সত্ত্বেও তারা চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারছিলেন না।
এ ধরনের পরিস্থিতি বিবেচনায় অসুস্থ আমানতকারীদের বিশেষ প্রয়োজনের অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। পরে শুধু আমানতকারী নয়, তার পরিবারের কোনো সদস্য গুরুতর অসুস্থ হলে কিংবা সন্তানের বিদেশে পড়াশোনার মতো বিশেষ প্রয়োজন দেখা দিলে অর্থ উত্তোলনের সুযোগও বাড়ানো হয়েছে।
তিনি জানান, শুরুতে এ ধরনের বিশেষ উত্তোলনের সীমা ১০ হাজার টাকা করা হয়েছিল। ভবিষ্যতে ধীরে ধীরে এই সীমা বাড়ানো হবে। তবে এখনই ২০ হাজার টাকা করার মতো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, আমানতকারীরা প্রয়োজনের সময় তাদের প্রয়োজনীয় অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পেলে ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়বে। কারণ ব্যাংক ব্যবসার মূল ভিত্তিই হলো আস্থা।
তার মতে, আস্থার সংকট তৈরি হলে কোনো ব্যাংকের পক্ষেই টিকে থাকা কঠিন। আবার জনগণের আস্থা অটুট থাকলে ভঙ্গুর অবস্থায় থাকা ব্যাংকও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
দেশের কয়েকটি ব্যাংকের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে যেসব ব্যাংক-কে রেটিংয়ে প্রথম সারির ব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাদের অনেককেই অতীতে কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারা এবং সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারার কারণেই তারা ধীরে ধীরে ব্যবসা বাড়িয়ে শক্ত অবস্থানে এসেছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, একীভূত ব্যাংকের আমানতকারীরা প্রয়োজনের সময় অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পেলে তাদের মাধ্যমে অন্য আমানতকারীদের মধ্যেও নতুন আস্থা তৈরি হবে। তখন মানুষ বিশ্বাস করবে, এটি আর সংকটপূর্ণ ব্যাংক নয়; এর মালিক রাষ্ট্র এবং আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষিত থাকবে।