ঢাকা: বাংলাদেশে নাগরিক সেবাকে পুরোপুরি ডিজিটাল ও সহজলভ্য করতে এক যুগান্তকারী উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। এখন থেকে শিশুর জন্মের পর স্বয়ংক্রিয়ভাবেই একটি ‘ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডি’ তৈরি হয়ে যাবে, যার মাধ্যমে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট এবং ভূমিসেবাসহ সব ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও তথ্য একটি মাত্র প্ল্যাটফর্মে পাওয়া সম্ভব হবে। এর ফলে দেশের নাগরিকদের আর আলাদা আলাদা পরিচয়পত্র বহন করতে হবে না কিংবা বিভিন্ন সরকারি দফতরে গিয়ে বারবার একই ব্যক্তিগত তথ্য জমা দেওয়ার ভোগান্তিতেও পড়তে হবে না।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ ধারণা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। আর প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এই মেগা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টার কর্মকর্তারা সারাবাংলাকে আরো জানান, সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী একটি সমন্বিত ডিজিটাল রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং ডিজিটাল অর্থনীতি বিনির্মাণে এরই মধ্যে এই বিষয়ে কাজ অনেকটাই এগিয়ে গেছে। জানান, সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ‘এক নাগরিক, এক ডিজিটাল আইডি, এক ডিজিটাল ওয়ালেট’ এই মেগা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে। খুব শিগরিরই জনগণের জন্য উন্মুক্ত হবে এই প্রকল্প।
জানা গেছে, সরকারের এই মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, জন্ম নিবন্ধন, এনআইডি, পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ভূমি এবং বিআরটিএ-সহ সব খাতের সরকারি ডাটাবেজকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হবে।
কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি বর্তমানে ধারণাপত্র বা কনসেপ্ট পেপার পর্যায়ে রয়েছে এবং এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের পরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে এর মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু হবে। এই রূপরেখা অনুযায়ী, হাসপাতালে কোনো শিশুর জন্ম হওয়া মাত্রই তার তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে জন্ম নিবন্ধন ব্যবস্থায় চলে যাবে এবং মা-বাবার জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে সমন্বয় করে নবজাতকের জন্য একটি স্থায়ী ডিজিটাল আইডি জেনারেট হবে। তবে যেসব শিশু হাসপাতালে নয় বরং বাড়িতে জন্ম নেবে, তাদের তথ্য যুক্ত করার জন্যও আলাদা সহজ প্রক্রিয়ার ব্যবস্থা রাখা হবে।
এই ডিজিটাল আইডির পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি স্মার্টফোনভিত্তিক বিশেষ ‘ডিজিটাল ওয়ালেট’ তৈরির পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে। এই ওয়ালেটে নাগরিকদের সব ধরণের পরিচয়পত্র, ডিজিটাল ক্রেডেনশিয়াল এবং প্রয়োজনীয় সরকারি নথি সংরক্ষিত থাকবে, যা ফিজিক্যাল বা কাগজের পরিচয়পত্রের বিকল্প হিসেবে যেকোনো সরকারি সেবায় লগইন বা পরিচয় যাচাইয়ের কাজে ব্যবহার করা যাবে। সব তথ্য এক প্ল্যাটফর্মে জমা থাকলেও নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা হবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, নাগরিকের নিজস্ব সম্মতি ছাড়া কোনো ব্যক্তিগত তথ্য অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শেয়ার করা হবে না এবং পুরো ব্যবস্থাটি ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন ও জাতীয় ডেটা গভর্নেন্স নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করে পরিচালিত হবে।
উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংক সমর্থিত ‘ডি-স্টার’ (ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাক্সেস অ্যান্ড রিজিলিয়ান্স) প্রকল্পের আওতায় এই পুরো উদ্যোগটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এই জন্য এস্তোনিয়া ও সিঙ্গাপুরের সফল ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেন্টিটি মডেল গভীরভাবে পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উপযোগী একটি শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।
এ প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে দেশের মানুষ অত্যন্ত সহজ, দ্রুত এবং যেকোনো ধরণের হয়রানিমুক্ত পরিবেশে একক ডিজিটাল পরিচয়ের মাধ্যমে যাবতীয় রাষ্ট্রীয় সেবা উপভোগ করতে পারবেন।