ঢাকা: পাঁচ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে দেশের ব্যাংক খাত। এসব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে- মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিএআর) মাইনাস(-) ২.৬৪ শতাংশ, খেলাপি ঋণ (এনপিএল) প্রায় ৩০ শতাংশ, সম্পদের বিপরীতে আয় (আরওএ) মাইনাস(-) ৪.৮১ শতাংশ এবং ইক্যুইটির বিপরীতে আয় (আরওই) মাইনাস (-) ২৪৩.৯ শতাংশ। পাশাপাশি আয়-ব্যয়ের অনুপাত ৯১ শতাংশ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ-এর পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এ সূচকগুলো তীব্র ব্যালেন্স শিট চাপ, দুর্বল মুনাফা এবং সীমিত পরিচালন দক্ষতা নির্দেশ করে। এর ফলে ভবিষ্যতে যেকোনো অভিঘাত সহ্য করার সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। যদিও সামগ্রিক স্তরে লিকুইডিটি কাভারেজ রেশিও এবং নেট স্টেবল ফান্ডিং রেশিও ১০০ শতাংশের ওপরে রয়েছে। যা একটি সামগ্রিক পর্যাপ্ত তারল্য পরিস্থিতি নির্দেশ করে। তথাপি বেশ কয়েকটি একক ব্যাংকে তারল্য সংকট বা চাপ বজায় রয়েছে, যা খাত-ভিত্তিক গড় চিত্রে পুরোপুরি প্রকাশ পায় না।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিভাগ-এর মতে, দেশের ব্যাংক খাত আর্থিক ঝুঁকির একটি উল্লেখযোগ্য উৎস হিসেবে রয়ে গেছে, যা ব্যাংক ব্যবস্থার কিছু অংশের সম্পদের গুণগত মান, মূলধনের পর্যাপ্ততা, তারল্য পরিস্থিতি এবং প্রতিষ্ঠানিক সুশাসনের গুরুতর দুর্বলতাকে প্রতিফলিত করে।
অর্থ বিভাগ বলছে, ব্যাংক খাতের এ দুর্বলতাগুলো আর্থিক মধ্যস্থতাকে বাধাগ্রস্থ করে, মুদ্রানীতির সঞ্চালনকে দুর্বল করে এবং সরকারিখাতের আকস্মিক সহায়তার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়ে বৃহত্তর সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করে। উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্বল মূলধন ভিত্তি, ক্রমাগত লোকসান এবং অসম তারল্য পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকগুলো সাধারণত নতুন ঋণ প্রদানে কড়াকড়ি আরোপ করে, উচ্চ ঋণ মার্জিন বা স্প্রেড বজায় রাখে এবং উৎপাদনশীল খাতগুলোতে ঋণের প্রবাহ কমিয়ে দেয়। টেকসই সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে, এই অবকাঠামোগত দুর্বলতাগুলো মধ্যমেয়াদে বেসরকারি বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ’
ঝুঁকি মোকাবেলায় করণীয় প্রসঙ্গে অর্থ বিভাগ বলেছে, এসব ঝুঁকিগুলো মোকাবেলার জন্য তদারকি ব্যবস্থা ধারবাহিক জোরদারকরণ, খেলাপি বা সংকটাপন্ন সম্পদের দ্রুত নিস্পত্তি, দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনঃমূলধনকরণ ও পুনর্গঠন এবং পুরো ব্যাংক খাত জুড়ে সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ব্যয় দক্ষতার উন্নয়ন ঘটাতে হবে।
এই ভঙ্গুর ব্যাংকব্যবস্থা বর্তমান সরকার উত্তারাধিকার সূত্রে পেয়েছে দাবি করে এ বিষয়ে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন,‘ বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আর্থিকখাতের যে বাস্তব অবস্থা স্পষ্ট হয়েছে, তা নি:সন্দেহে উদ্বেগজনক। র্দীর্ঘদিনের অনিয়ম, প্রভাবনির্ভর ও বেনামি ঋণ প্রদান, অস্বচ্ছতা, পুন:তফসিলকরণ সুবিধার অপব্যবহার এবং বিধি-বিধানের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র আড়াল করে প্রবণতা ব্যাংক ব্যবস্থার ভিতকে দুর্বল করে দিয়েছে।
তিনি বলেন, গত ২০০৫ সালে ডিসেম্বরে সামগ্রিক ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩ .৬ শতাংশ, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরেরর ১ম প্রান্তিকে বেড়ে ৩৫.৩৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, এর পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এর পরিণতিতে অনেক ব্যাংকে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে, আমানতকারীদের আস্থা ক্ষুন্ন হয়েছে এবং কিছু কিছু ব্যাংকের ক্ষেত্রে পুনর্গঠন অথবা একীভূতকরণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।