ঢাকা: জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের ফোর্স কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য সাইপ্রাসে যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ মিনহাজুল আলম।
বুধবার (৩ জুন) বিকেলে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামছুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। সাক্ষাৎকালে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকা, পেশাদারত্ব এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সশস্ত্র বাহিনীর সুনাম ও গৌরবের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি হাসান শিপলু এই বৈঠকের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিনহাজুল আলম আগামী শুক্রবার (৫ জুন) নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন। সেখানে দাফতরিক কার্যক্রম শেষ করে তিনি সাইপ্রাসে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনী বা ইউএনএফআইসিওয়াইপি-এর ২৩তম ফোর্স কমান্ডার হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে মিনহাজুল আলম অষ্টম সেনা কর্মকর্তা, যিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ফোর্স কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন। এর আগে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের সাতজন সেনা কর্মকর্তা বিশ্বের আটটি ভিন্ন দেশে এই মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথম বাংলাদেশি ফোর্স কমান্ডার হিসেবে ১৯৯৩ সালে মোজাম্বিকে দায়িত্ব পালন করেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (মরহুম) আনিসুর রহমান। এর পরের বছর ১৯৯৪ সালে একই দেশে দায়িত্ব নেন মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আবדוস সালাম। এ ছাড়া মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহি আকবর সুদানে, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আবু তায়েব মুহাম্মদ জহিরুল আলম লাইবেরিয়ায়, মেজর জেনারেল আবদুল হাফিজ আইভরি কোস্ট ও পশ্চিম সাহারায় এবং মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির সাইপ্রাসে ফোর্স কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে মেজর জেনারেল মো. ফখরুল আহসান পশ্চিম সাহারায় এই দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। বর্তমানে জাতিসংঘের ১০টি শান্তিরক্ষা মিশনে বিভিন্ন দেশের মোট ১০ জন সামরিক কর্মকর্তা ফোর্স কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করছেন। মিনহাজুল আলম সাইপ্রাসে দায়িত্ব নিলে মেজর জেনারেল মো. ফখরুল আহসানের পাশাপাশি ফোর্স কমান্ডার পর্যায়ে একই সময়ে দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশি সেনা কর্মকর্তার সংখ্যা দাঁড়াবে দুইজনে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম শীর্ষ অবদানকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে এবং মিনহাজুল আলমের এই নতুন নিয়োগ সেই গৌরবময় ধারাবাহিকতারই অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাইপ্রাসে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনী ১৯৬৪ সালে গ্রিক সাইপ্রিয়ট ও তুর্কি সাইপ্রিয়ট সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মিশনটির প্রধান দায়িত্ব হলো জাতিসংঘের বাফার জোন বা গ্রিন লাইন বজায় রাখা এবং বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি রেখাগুলোর তত্ত্বাবধান করা। মিশনটির জন্য অনুমোদিত মোট জনবল ১ হাজার ৯০ জন। ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী সেখানে ৭২৭ জন সামরিক সদস্য, ৬০ জন পুলিশ কর্মকর্তা এবং ১৪৮ জন বেসামরিক কর্মী কর্মরত ছিলেন। এই বিশেষ মিশনে বিশ্বের ১৮টি দেশের সামরিক সদস্যরা অংশ নিচ্ছেন।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিনহাজুল আলম ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে পদাতিক কোরে কমিশন লাভ করেন এবং কৃতিত্বের স্বাক্ষর হিসেবে সোর্ড অব অনার অর্জন করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অপারেশন কুয়েত পুনর্গঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা–সংশ্লিষ্ট একটি ব্রিগেডের নেতৃত্বও প্রদান করেন। তিনি সেন্ট্রাল আফ্রিকায় জাতিসংঘ বাহিনীর সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের চিফ ইনস্ট্রাক্টর ও কমান্ড্যান্ট এবং বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। জাতিসংঘে ফোর্স কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি সর্বশেষ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ডের জিওসি হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং এর আগে কক্সবাজার এলাকায় ১০ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।