Friday 21 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে ভাষা শহিদদের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:৫৬ | আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪:৪০

ঢাকা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার। ছবি: সারাবাংলা

ঢাকা: শনিবারের শান্ত সকাল। কিন্তু ঢাকার রাজপথে আজ অন্যরকম এক জাগরণ। জনস্রোতের কলতান জানান দিচ্ছিল আজ সেই বিশেষ দিন। যে দিনটি আমাদের মাথা নোয়াবার নয়, বরং মাথা উঁচু করে বাঁচার দিন। ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। ক্যালেন্ডারের পাতায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হলেও বাঙালির কাছে এটি হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত এক পরম মমতার নাম।

সকাল থেকেই ঢাকার রাজপথ গিয়ে মিশেছে এক ঠিকানায়- কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। হাতে ফুল আর পরনে সাদা-কালো পোশাক, চোখেমুখে বিনম্র শ্রদ্ধার ছাপ। একে একে সারিবদ্ধভাবে মানুষ এগিয়ে যাচ্ছেন বেদির দিকে। একেকটি পুষ্পস্তবক যখন বেদিতে রাখা হচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন ভাষা শহিদদের প্রতি জাতির ভালোবাসার এক একটি পঙক্তি রচিত হচ্ছে। ইডেন কলেজ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে টিআইবি কিংবা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ স্তরে স্তরে সংগঠনের ব্যানার আর ফুলের ভারে ঢেকে গেছে মূল বেদি।

বিজ্ঞাপন

ছবি: সারাবাংলা

শহিদ মিনারের এই জনসমুদ্রে কেবল প্রবীণ বা তরুণরা নন, নজর কাড়ছে শিশুদের উপস্থিতিও। মা-বাবার হাত ধরে ছোট্ট শিশুরাও এসেছে আজ। তাদের কপালে আঁকা জাতীয় পতাকা, হাতে ধরা রক্তিম গোলাপ। অভিভাবকরা সন্তানদের কাছে তুলে ধরছেন ১৯৫২-র সেই উত্তাল সময়ের গল্প।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাহাত্তর বছর বয়সী রফিকুল আজাদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘৫২-র সেই উত্তাল দিনগুলো আমাদের স্বাধীনতার বীজ বুনে দিয়েছিল। আমরাই তো সেই জাতি, যারা মায়ের ভাষার মান বাঁচাতে রাজপথ রক্তে রাঙাতে দ্বিধা করেনি। আজ এখানে এসে যখন দাঁড়াই, তখন মনে হয় আমাদের অস্তিত্বের শিকড় কতটা গভীর।’

ছবি: সারাবাংলা

হাজার হাজার মানুষের এই ভিড় সামলাতে কাজ করছেন বিএনসিসি ও স্কাউটসের একদল নিবেদিতপ্রাণ তরুণ। মাহাদি হাসানের চোখেমুখে ছিল গর্বের ছাপ। তিনি বলেন, ‘মানুষের এই বিশাল স্রোত সামলানো কঠিন হলেও তাদের শ্রদ্ধা আর শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধা দেখে আমরা মুগ্ধ। সবাই খুব শান্তভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে শহিদদের সম্মান জানাচ্ছেন। এটা দেখে বোঝা যায়, একুশের চেতনা আমাদের কতটা ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারে।’

ইডেন কলেজের শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার যখন বেদিতে ফুল দিচ্ছিলেন, তখন তার চোখে ছিল দীপ্তি। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বইয়ের পাতায় যা পড়ে বড় হয়েছি, এখানে এসে সেই স্পন্দন অনুভব করি। একুশ মানে শুধু শোক নয়, একুশ মানে আমাদের অধিকার আদায়ের লড়াকু পরিচয়। প্রতি বছর এখানে না এলে যেন নিজের সত্তার সাথে সংযোগটা ঠিকঠাক অনুভব করতে পারি না।’

ছবি: সারাবাংলা

ভিড়ের মাঝে দেখা মিলল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনন্যা রায়ের সাথে। তিনি তার ছোট ভাইকে নিয়ে এসেছেন বর্ণমালার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে। তিনি বলেন, ‘আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে একুশ মানে কেবল একটি ছুটির দিন নয়, বরং নিজেদের ভাষায় কথা বলার যে অধিকার, তার উৎস। আমি চাই আমার ভাইয়েরাও যেন এই ত্যাগের ইতিহাস বুক দিয়ে আগলে রাখে।’

পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ রাইয়ান আহমেদ নিজের মত প্রকাশ করে বলেন, ‘ডিজিটাল যুগে আমরা অনেক ভাষা শিখি, কিন্তু বাংলার যে মাধুর্য তা অনন্য। আজ শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে শপথ নিচ্ছি, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে এবং প্রযুক্তি বিশ্বে বাংলাকে আরও মর্যাদাপূর্ণ স্থানে নিয়ে যাব।’

ছবি: সারাবাংলা

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় আরও বাড়ছে। শহিদ মিনারের চারপাশ প্রকম্পিত হচ্ছে সেই কালজয়ী সুরে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…’। ফুলে ফুলে ভরে ওঠা বেদিটি যেন সাক্ষ্য দিচ্ছে, সাত দশক পরেও বাঙালির হৃদয়ে একুশের চেতনা অম্লান, অমলিন।

ছবি: সারাবাংলা

সারাবাংলা/এফএন/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর