জীবনের আঁকাবাঁকা অচেনা পথে চলতে গিয়ে বহুবার আমাদের পথ আটকে দাঁড়ায় কালচে কোনো বিশাল পাহাড়, আর প্রতিটি মোড়ে থাবা বসায় একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যর্থতা। কখনো ভালোবাসার মানুষের কোল খালি হওয়া, কখনো চাকরির বাজারের করুণ ধাক্কা, আবার কখনো হাজার চেষ্টার পরও ব্যবসার নামমাত্র লাভ না পাওয়ার হতাশা, আমাদের মনকে প্রতিনিয়ত ঠেলে দেয় এক গভীর অন্ধকার কুয়োর দিকে। চারপাশের প্রতিটি পরিস্থিতি যখন চিৎকার করে বলে উঠে যে আর সম্ভব নয়, হাল ছেড়ে দেওয়াটাই এখন একমাত্র বুদ্ধিমানের কাজ, ঠিক তখনই বুকের ভেতরে থাকা সেই ছোট্ট এক টুকরো জেদ ফিসফিস করে বলে ওঠে, ‘আরেকবার চেষ্টা করে দেখা যাক।’ পৃথিবীর সমস্ত বৈরী ঝড়ঝাপটা আর অসম্ভব শব্দটাকে এক তুড়িতে উড়িয়ে দিয়ে আবারও উঠে দাঁড়ানোর এই অদম্য মানসিকতার সামনে হার মানতে বাধ্য হয়েছে ইতিহাস কাঁপানো বড় বড় বাধা। সেই অটুট আত্মবিশ্বাস, ভেতরের ঘুমন্ত ইচ্ছাশক্তি আর কখনো পরাজয় শিকার না করার সেই অসীম সাহসকে কুর্নিশ জানানোর বার্তা নিয়েই ঘুরে এসেছে আজকের এই বিশেষ সময়, কারণ আজ ১৮ আগস্ট বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক ‘কখনও হার না মানার দিবস (Never Give Up Day)’ হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে।
অদম্য জেদ থেকে বিশ্ব কাঁপানো ইতিহাস
ব্যর্থতার ছাইভস্ম থেকে ফিনিক্স পাখির মতো নতুন করে বেঁচে ওঠার এই অদ্ভুত ভাবনার পেছনের ইতিহাসটি কিন্তু খুব বেশি পুরোনো নয়। ২০১৯ সালে ফরাসি বংশোদ্ভূত আলেন হোরো নামের এক উদ্যোক্তার মনের গভীর ভাবনা থেকে এই অনুপ্রেরণাদায়ক উদযাপনের গোড়াপত্তন ঘটেছিল। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, আধুনিক যুগের চরম প্রতিযোগিতামূলক ইঁদুর দৌড়ে সামান্য একটু হোঁচট খেলেই মানুষ মানসিকভাবে একদম ভেঙে পড়ে এবং নিজের জীবন নিয়ে চরম হতাশায় ভোগে। এই যন্ত্রণাদায়ক অবস্থা থেকে মানুষকে টেনে তুলতে এবং যেকোনো মূল্যে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা ফুটিয়ে তুলতে তিনি অগাস্ট মাসের ১৮ তারিখকে এক বিশেষ সংকল্পের দিন হিসেবে নির্ধারণ করেন। ২০২১ সালে বিশ্বজুড়ে এই বার্তাটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন দেশে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আন্দোলন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের ভেতরের লড়াই করার মানসিকতাকে চিরতরে সজীব রাখা।
ইতিহাস বদলে দেওয়া কিছু অদম্য জীবনের গল্প
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, সফলতার চূড়ায় পৌঁছানো প্রতিটি মানুষের পথই তৈরি হয়েছিল অজস্র পরাজয় আর কষ্টের ওপর ভর করে। বৈজ্ঞানিক থমাস আলভা এডিসন বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কারের আগে হাজার বার ব্যর্থ হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি সেই ব্যর্থতাকে হার না মেনে শেখার হাজারটি উপায় হিসেবে দেখেছিলেন। হ্যারি পটার উপন্যাসের বিখ্যাত লেখিকা জে কে রাওলিং বারোটি আলাদা প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়েও লেখার খাতা বন্ধ করেননি। আবার বিশ্বখ্যাত মার্কিন প্রযুক্তিবিদ স্টিভ জবসকে নিজের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি থেকেই অপমান করে বের করে দেওয়া হয়েছিল, অথচ সেই পরাজয়কে তিনি নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর হাতিয়ার বানিয়ে বিশ্ব প্রযুক্তির রূপই বদলে দিয়েছিলেন। এরা প্রত্যেকেই প্রমাণ করেছেন যে জীবন যতবারই আপনাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেবে, ততবারই দ্বিগুণ শক্তিতে আবার উঠে দাঁড়ানোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মানুষের আসল সৌন্দর্য।
ঘুরে দাঁড়ানোর সহজ উপায়
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, যেকোনো খারাপ পরিস্থিতিতে হাল ছেড়ে না দিয়ে নতুন করে লড়াই করার চর্চাটি মানুষের মস্তিষ্কে ডোপামিন ও এন্ডোরফিন নামের দুটি ইতিবাচক রাসায়নিক উপাদানের মাত্রাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই চর্চা কেবল মানুষের মনের ভেতর থেকে হতাশা আর ভয়কে দূর করে না, বরং মানসিক সহনশীলতা ও আত্মবিশ্বাসকে অনেক শক্তিশালী করে তোলে। জীবনে ব্যর্থ হওয়া মানেই কিন্তু সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়, বরং সেটি হলো আপনার ভুলগুলো শুধরে নিয়ে নতুন পথ খুঁজে বের করার এক চমৎকার সুযোগ। জীবনের কঠিন সময়ে কোনো অবস্থাতেই থেমে না গিয়ে অল্প অল্প করে হলেও প্রতিদিন সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই হলো নিজেকে সবসময় ইতিবাচক রাখার সবচেয়ে বড় দাওয়াই।
পরাজয়ের ধুলো ঝেড়ে ফেলে সগর্বে লড়াই চালিয়ে যান
জীবন হয়তো আপনাকে অগণিত বার ভাঙবে, আপনার স্বপ্নগুলোকে তছনছ করে দিয়ে দিশেহারা করে দেবে, কিন্তু আপনার ভেতরের অদম্য ইচ্ছাটিকে কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা পৃথিবীর কোনো শক্তির নেই। আজকের এই বিশেষ মুহূর্তে আপনার জীবনজুড়ে জমতে থাকা সমস্ত পরাজয়ের গ্লানিকে ধুলোর মতো ঝেড়ে ফেলুন এবং নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে আবারও নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিন। অন্ধকার রাত যত দীর্ঘই হোক না কেন, সূর্য উঠবেই এবং আলো আসবেই এই মহাজাগতিক সত্যকে মনে ধারণ করে এগিয়ে চলুন। আজ থেকে একটাই নতুন সংকল্প হোক আপনার চলার পথের মন্ত্র যতবারই পরিস্থিতি আমার পথ আটকে দাঁড়াবে, ততবারই আমি আরও বেশি শক্ত হয়ে বলব, আমি থামব না এবং আমি কখনো হার মানব না।