ঢাকা: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা আরও জোরদার করতে দুটি পৃথক বিজনেস-টু-বিজনেস (বিটুবি) টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে ভারতের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি (সিআইআই)। এর একটি টাস্কফোর্স অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে কাজ করবে। অন্যটি নতুন ও উদীয়মান প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে যৌথ বিনিয়োগ ও ব্যবসার সুযোগ তৈরিতে কাজ করবে।
মঙ্গলবার(১৮আগস্ট) ঢাকায় ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সঙ্গে সিআইআইয়ের প্রতিনিধি দলের বৈঠকে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়। এর আগে সকালে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠকে একই প্রস্তাব তুলে ধরে ভারতীয় প্রতিনিধি দল। বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দুটিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রী আবদুল আওয়াল মিন্টু এমপি। এতে সিআইআইয়ের মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জী, দ্য ইনফ্রাভিশন ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা ট্রাস্টি ভিনায়ক চট্টোপাধ্যায়, গ্রোদরেজ ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট রাকেশ স্বামী এবং এফবিসিসিআই সাবেক সভাপতি জসিম উদ্দিনসহ দুই দেশের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে সিআইআইয়ের মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোই তাঁদের ঢাকা সফরের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে নিয়মিত বিটুবি বৈঠক আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ভারতীয় প্রতিনিধি দলে হাসপাতাল, প্রকৌশল, ভোক্তা পণ্য ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতের প্রায় ১০ জন শিল্প উদ্যোক্তা রয়েছেন। তাদের অনেকেরই বাংলাদেশে বিনিয়োগ রয়েছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগ করতে তারা আগ্রহী। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও অঞ্চলের বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরিতেও সিআইআই সহযোগিতা করতে চায়।
প্রস্তাবিত প্রথম টাস্কফোর্সের মূল লক্ষ্য হবে অবকাঠামো খাতে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো। এর আওতায় অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি, বিদেশি বিনিয়োগ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হবে।
চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জী বলেন, ভারতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বেসরকারি মূলধন অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে। ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে ভারত বিভিন্ন ধরনের পিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। এসব প্রকল্পের কিছু সফল হয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থতাও এসেছে। ফলে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারী, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন তহবিলকে কীভাবে অবকাঠামো খাতে আনা যায়, সে বিষয়ে ভারতের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে এই অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করার প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশও বড় সেতু, রেলপথ, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, গ্যাসভিত্তিক প্রকল্প ও মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। তাই দুই দেশই একে অপরের অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হতে পারে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, অবকাঠামো টাস্কফোর্সের বৈঠক প্রতি তিন মাসে একবার আয়োজন করা হবে। এক প্রান্তিকে বাংলাদেশে এবং পরের প্রান্তিকে ভারতে বৈঠক করার মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের সরাসরি যোগাযোগ আরও বাড়ানো হবে।
দ্বিতীয় টাস্কফোর্সের কাজ হবে নতুন ও উদীয়মান প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানো। এ ক্ষেত্রে নিউক্লিয়ার পাওয়ার, সেমিকন্ডাক্টর, হাইড্রোজেন ও অ্যামোনিয়া, গ্রিন এনার্জি, ব্যাটারি স্টোরেজ, হাই-স্পিড ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সৌরবিদ্যুৎ এবং সৌর প্যানেল, সেল ও মডিউল উৎপাদনকে সম্ভাবনাময় ‘সানরাইজ সেক্টর’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিআইআই। এর সঙ্গে বায়োটেকনোলজিসহ আরও কয়েকটি খাত যুক্ত করা যেতে পারে।
চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জী বলেন, প্রচলিত ব্যবসার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পেও এখন দুই দেশের ব্যবসায়ীদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এসব খাতে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং যৌথ উদ্যোগের বড় সুযোগ রয়েছে।
এই টাস্কফোর্সের মাধ্যমে কোন প্রযুক্তি কোথা থেকে পাওয়া যাচ্ছে, কোথায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং কীভাবে দুই দেশের প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে এগিয়ে যেতে পারে—এসব বিষয়ে নিয়মিত আলোচনা করা হবে। ভারত ইতোমধ্যে সেমিকন্ডাক্টরসহ বিভিন্ন নতুন প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ ও যৌথ উদ্যোগ নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বৈঠকে সিআইআইয়ের প্রতিনিধি দল দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি ব্যবসায়িক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেয়। তাদের মতে, নিয়মিত বিটুবি যোগাযোগ বাড়ানো গেলে দুই দেশের বেসরকারি খাত নিজেদের স্বার্থে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে পারবে। এ জন্য প্রতি তিন মাসে বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের পারস্পরিক সফরের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়। এতে বিনিয়োগের সুযোগ, নতুন বাজার, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও যৌথ উদ্যোগ নিয়ে সরাসরি আলোচনা করা সম্ভব হবে।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, ভারতীয় প্রতিনিধি দলের প্রস্তাব দুটি ইতোমধ্যে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে অবকাঠামো উন্নয়নে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে ভারতের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তিনি বলেন, শুধু দেশীয় বিনিয়োগ নয়, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন তহবিল ও বিনিয়োগকারীদের অবকাঠামো খাতে কীভাবে আকৃষ্ট করা যায়, সে বিষয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশ অভিজ্ঞতা নিতে পারে।
নতুন ও উদীয়মান শিল্পের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত জ্বালানি ও প্রচলিত শিল্পের বিষয় সামনে আসে। তবে এর বাইরে নতুন প্রযুক্তি ও উদীয়মান শিল্পেও বিনিয়োগের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। সিআইআই এসব খাতকে আলোচনায় আনার যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক ও সময়োপযোগী।