Tuesday 18 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

অভিযোগ থেকে তদন্ত, রাবিতে শিক্ষক শাস্তির পুরো প্রক্রিয়া কী?

নাসিমুল মুহিত ইফাত, রাবি করেসপন্ডেন্ট
১৮ আগস্ট ২০২৬ ১৯:১৮

রাবি: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই সরাসরি শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় না। অভিযোগের ধরন ও গুরুত্ব বিবেচনায় প্রাথমিক অনুসন্ধান, ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং বা তদন্ত কমিটি গঠন, অভিযুক্তের বক্তব্য গ্রহণ, প্রতিবেদন পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন হলে পৃথক ইনকোয়ারি কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে এগোয় প্রক্রিয়াটি। সবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের অনুমোদনের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অভিযোগে কয়েকজন শিক্ষককে শাস্তি দেওয়ার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এই তদন্ত ও শাস্তিমূলক প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগের পর প্রথম ধাপ

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার পর অভিযোগের ধরন ও গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রশাসন প্রাথমিক অনুসন্ধান, ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটি অথবা তদন্ত কমিটি গঠন করতে পারে। তদন্ত কমিটি সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্য এবং অন্যান্য তথ্য যাচাই করে প্রতিবেদন দেয়। অভিযোগের সত্যতা বা অভিযুক্ত ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উঠে এলে পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

রাবির রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) ইফতেখারুল আলম মাসউদ বলেন, ‘অভিযোগের মাত্রা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তদন্ত কমিটি গঠনের দরকার হলে ভিসি স্যার সিন্ডিকেট সাপেক্ষে সেটা করেন। তদন্ত কমিটি রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর সেটা সিন্ডিকেট সভায় খোলা হয় এবং রিপোর্ট অনুমোদন করা হয়।’

অভিযোগ উঠলেই কি শাস্তি?

শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো শিক্ষককে চূড়ান্তভাবে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ নেই বলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর অভিযুক্তকে কারণ দর্শানোর নোটিশ বা শোকজ করা হয়। সেখানে অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য ও ব্যাখ্যা নেওয়া হয়।

অভিযোগের ধরন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা নথির সংখ্যা বেশি হলে তদন্তে সময়ও বেশি লাগতে পারে। এ প্রক্রিয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই বলে জানিয়েছেন রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) ইফতেখারুল আলম মাসউদ।

তদন্ত কমিটি কীভাবে কাজ করে?

তদন্ত কমিটির মূল কাজ হলো অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া, প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ এবং অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। তদন্ত শেষে কমিটি প্রশাসনের কাছে প্রতিবেদন দেয়। সেখানে অভিযোগের বিষয়ে পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ থাকতে পারে। তবে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নেওয়া হয়।

শাস্তির সুপারিশ থাকলে পরের ধাপ কী?

রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) ইফতেখারুল আলম মাসউদ বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে শাস্তির সুপারিশ থাকলে সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তের একজন প্রতিনিধিসহ ৩ সদস্যের আরেকটি ইনকোয়ারি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি প্রতিবেদন দেওয়ার পর বিষয়টি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সিন্ডিকেটে উপস্থাপন করা হয়।

রাবির সিন্ডিকেট সদস্য নিজাম উদ্দিনও একই প্রক্রিয়ার কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর শাস্তির সুপারিশ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিতে অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষ থেকেও একজন সদস্য থাকার সুযোগ থাকে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সিন্ডিকেটে

৩ সদস্যের কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি সিন্ডিকেটে আসে। তদন্ত প্রতিবেদন, অভিযুক্তের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে সিন্ডিকেট শাস্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে চূড়ান্ত কমিটির প্রতিবেদন আসার আগ পর্যন্ত বিষয়টি পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।

প্রয়োজন মনে করলে সিন্ডিকেট বা উপাচার্য রিভিউ করতে পারেন এবং প্রয়োজনে রিভিউ কমিটিও গঠন করা যেতে পারে বলে জানান, সিন্ডিকেট সদস্য নিজাম উদ্দিন। তার ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী গঠিত চূড়ান্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সাধারণত আর পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকে না।

কী ধরনের শাস্তি হতে পারে?

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাবিতে বিভিন্ন অভিযোগে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চাকরিচ্যুতি, বরখাস্ত, পদাবনতি এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতির মতো শাস্তি রয়েছে।

গত ৫ বছরে পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক প্রভাস কুমার, মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক উম্মে হাবিবা জেসমিন এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক সালমা খাতুনকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এছাড়া আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাদিকুল ইসলাম সাগরকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

৫ বছরে একাধিক শিক্ষক শাস্তির আওতায়

যৌন হয়রানি, অ্যাকাডেমিক অনিয়ম, দুর্নীতি, কর্মস্থলে অনুপস্থিতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে গত পাঁচ বছরে রাবির একাধিক শিক্ষককে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। অভিযোগের ধরন অনুযায়ী শাস্তির মাত্রাতেও পার্থক্য রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই আমরা সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিই না। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত কমিটি করা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘শিক্ষক-কর্মকর্তা যেই হোন না কেন, অনিয়ম, দুর্নীতি বা যৌন হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ধরনের ছাড় দেবে না। একই সঙ্গে অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাও প্রশাসনের দায়িত্ব।’

সারাবাংলা/এসএস