ঢাকা: দেশবিভাগ-ভাষা আন্দোলন-মুক্তিযুদ্ধ— ধারাবাহিক উত্তরাধিকার হয়ে এসব আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন মা-মাটি ও মানুষের পাশে; দেশ স্বাধীনের পর আবারও ফেরেন শ্রমজীবী মানুষের কাতারে। তাদের দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্তির পথপ্রদর্শক হিসেবে লড়তে থাকেন আবিরাম। কারণ, তিনি খুঁজতেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মুক্তিরপথ। এভাবেই খুঁজতে খুঁজতে একসময় তিনি সমকালীন রাজনীতির পালাবদলে যোগ দেন বিএনপিতে। মেহনতি মানুষের কণ্ঠস্বর মাওলানা ভাসানীর হাত ধরে যার রাজনীতি শুরু, সেই নেতা শেষ পর্যন্ত গিয়ে তরী ভেড়ান আধুনিক গণতন্ত্রের স্বপ্নদ্রষ্টা শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া সংগঠন বিএনপিতে। আর এই তরীই শেষ পর্যন্ত তাকে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়। তখন সেই ভাষাসৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও শ্রমিক নেতা ‘মির্জা মোরাদুজ্জামান’ সব পরিচয় ছাপিয়ে হয়ে ওঠেন জনগণের ‘মুরাদ ভাই’।
জন্ম ও বেড়ে ওঠা
১৯৩৯ সালের ১১ মার্চ। সিরাজগঞ্জ সদর থানার কাওয়াকোলা ইউনিয়নের কুড়িপাড়া গ্রামে সম্রান্ত এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জননেতা মির্জা মোরাদুজ্জামান। তার পিতার নাম মির্জা জহিরউদ্দিন। তিনি ছিলেন তদানীন্তন কংগ্রেস আন্দোলনের স্থানীয় নেতা। সেই নেতার রক্তের উত্তরাধিকার হিসেবে মির্জা মোরাদুজ্জামানের চেতনায়ও বইতে থাকে রাজনীতির স্রোত। ফলে সিরাজগঞ্জ মুসলিম হাই স্কুলে অধ্যায়নরত অবস্থায় প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। মূলত ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই রাজনীতিতে সক্রিয় হন মোরদুজ্জামান। তৎকালীন ছাত্র ফেডারেশন ও ছাত্র ইউনিয়ন থেকে ১৯৫৭ সালে যোগ দেন মাওলানা ভাসানী প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে। একসময় তিনি সিরাজগঞ্জ মহকুমা ন্যাপের সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিড়ি-শ্রমিকদের সংগঠন ও রিকশা-টমটম গাড়ি শ্রমিকদের সংগঠিত করেন। এমনকি তিনি ওই দু’টি সংগঠনের সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। এভাবেই মির্জা মোরাদুজ্জামান শ্রমিক নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
মুক্তিযুদ্ধপূর্ব রাজনীতিতে অবদান
১৯৫৮ সাল। পাকিস্তানে চলছিল আইয়ুব খানের সামরিক শাসন। সেই শাসনের মধ্যেই বিড়ি শ্রমিকদের সংগঠিত করে পাট-সমৃদ্ধ সিরাজগঞ্জে জুটমিল প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলনের ফলে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল আজম খান সিরাজগঞ্জে আসেন এবং নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর সিরাজগঞ্জ জুট মিলস প্রতিষ্ঠা করেন। সেই জুট মিলে বেকার অনেক বিড়ি শ্রমিক চাকরি পায়। ১৯৬৩ সালে মিল শ্রমিকদের নিয়ে কওমি মজদুর ইউনিয়ন গঠনেও তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৪ সালে কওমি জুট মিলের শ্রমিক নেতারা বন্দি হয়ে কারাগারে গেলে তিনি ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রায় একই সময় সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবে মির্জা মোরাদুজ্জামান সিরাজগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচনে বিপুল ভোটে সদস্য পদে জয়লাভ করেন এবং কাওয়াকোলা ইউনিয়নের বিডি মেম্বর নির্বাচিত হন। ১৯৬৭ সালে আইয়ুব খান ও পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনিসহ ১৭ নেতাকর্মী গ্রেফতার হন। দীর্ঘ ১১ মাস কারা ভোগের পর ফের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। মির্জা মোরাদুজ্জামান অকুতোভয় নেতা মাওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক সহকর্মী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি একসময় জেলা ন্যাপের সভাপতিও নির্বাচিত হন।
মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা
১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চের দিনগুলোতে মির্জা মোরাদুজ্জামান তার রাজনৈতিক গুরু মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে ছিলেন। পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠী ২৫ মার্চ নিরীহ বাঙালিরদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায়। এর পর দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভাসানীর সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নেন। এ সময় তিনি দেশের ভেতরে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন। এর পর বর্হিবিশ্বের মাধ্যমে স্বাধীনতার পক্ষে চাপ সৃষ্টির জন্য মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে নদী পথে আসাম দিয়ে যাত্রা শুরু করলে ভারত সরকার তাদের আমন্ত্রণ জানায় ও বাংলাদেশকে সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। এক পর্যায়ে তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে। এর পর দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।
মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী রাজনীতিতে অবদান
১৯৭৬ সালে মাওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর এবং শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলে মির্জা মোরাদুজ্জামান তার সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে পড়েন। তিনি বিএনপির প্রথম জাতীয় নির্বাহী কমিটির (আহবায়ক কমিটি) প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পান এবং সেইসঙ্গে সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপি’র সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মির্জা মোরাদুজ্জামান পরবর্তী সময়ে বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পবিষয়ক সম্পাদক এবং সর্বশেষ তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
জনতার ‘মুরাদ ভাই’ ১৯৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করায় স্বৈরাচারের স্থানীয় দোসরদের ষড়যন্ত্রে দৈহিক নির্যাতনের শিকার হন ও কারা নির্যাতন ভোগ করেন। স্বৈরাচারের পতনের পর ১৯৯১ সালে ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ সদর আসন থেকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর সার্বজনীন কাজের দিকে নজর দেন।
দেশ গঠনে অবদান
মির্জা মোরাদুজ্জামান মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য, শ্রম ও জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন। জনপ্রতিনিধি হিসাবে মির্জা মোরাদুজ্জামান ছিলেন অন্যদের চেয়ে আলাদা বৈশিষ্ট্যের। আবালবৃদ্ধবণিতা ও সর্বশ্রেণী-পেশার মানুষ তার কাছে অবাধে যেতে পারতেন এবং তাদের দুঃখ-কষ্ট ও সমস্যার কথা অকপটে বলতে পারতেন। সে কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সকলের প্রিয় ‘মুরাদ ভাই’।
মির্জা মোরাদুজ্জামান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহযোগিতায় স্কুল, কলেজ, মসজিদ-মাদরাসা, কবরস্থান, মন্দির, রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভাট নির্মাণে তার সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রূপান্তর ও অনার্স-মাস্টার্স কোর্স চালু হয় তার আমলেই। সিরাজগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাণিজ্য ভবন ও শিক্ষার্থীদের জন্য হোস্টেল নির্মাণে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি মাওলানা ভাসানী ডিগ্রি কলেজ, যমুনা ডিগ্রি কলেজ, শিমলা ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং বাগবাটির ‘আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ’ ডিগ্রি কলেজ এমপিওভুক্ত করেন। এ ছাড়াও, সিরাজগঞ্জ শহীদ শামসুদ্দিন স্টেডিয়াম, সদর হাসপাতাল আধুনিকরণ, নার্সিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, সিরাজগঞ্জ বার ভবন ও যমুনা বহুমুখী সেতু নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
১৯৯৫ সালের ১০ জুলাই জাতীয় সংসদের নিজের জীবনের শেষ বক্তব্যে সরকারের কাছে নিজের এলাকার জনগণের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবের কথা, উন্নয়নের কথা, উন্নয়নের মাঝে বেঁচে থাকার কথা বলেন। সেদিন তিনি বাংলাদেশে একটি আধুনিক ক্যানসার ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি উত্থাপন করেন।
জনতার ‘মুরাদ ভাই’র প্রয়াণ
মির্জা মোরাদুজ্জামান ১৯৯৫ সালে মৃত্যুব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত হলে প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর পর অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ভারতের বোম্বে টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। সেখানে অল্প কিছুদিন চিকিৎসার পর তিনি দেশে ফিরে ফের অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তাকে আবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৯৯৫ সালের ১৮ জুলাই ভোরে সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন জনতার ‘মুরাদ ভাই’।
মির্জা মোরাদুজ্জামানের মৃত্যুর সংবাদ শোনার পর তাৎক্ষণিক শোক প্রকাশ করে মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই সংগঠকের মৃত্যুর পর তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান করা হয়। এর পর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় প্রথম জানাজা এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় নয়াপল্টনের সামনে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অংশ নেন তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের সদস্যরাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা।
এর পর হেলিকাপ্টার যোগে তার মরদেহ সিরাজগঞ্জে আনা হলে সর্বজনবিদিত প্রিয় নেতার মুখ শেষ বারের মতো দেখার জন্য শোকার্ত মানুষের ঢল নামে। সেদিন জেলার সবদলের নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সংগঠনের প্রতিনিধিরা সিরাজগঞ্জ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ মাঠে স্মৃতিচারণ করে আবেগ ঘন বক্তব্য দেন। এর পর লাখো জনতার অংশগ্রহণে তার জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে সিরাজগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানোর পর মির্জা মোরাদুজ্জামানকে মালশাপাড়া কবরস্থানে দাফন করা হয়।
মির্জা মোরাদুজ্জামান ছিলেন সৎ, দায়িত্ববান ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। তার জীবনের ব্রত ছিল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। তিনি নেতা হয়েও ছিলেন জনগণের কাতারে মানুষ। তাইতো জনগণ তাকে নির্দ্বিধায় ‘মুরাদ ভাই’ সম্বোধনে ডাকতে পারতো এবং আবদার করতে পারতো। জনগণের সেই ‘মুরাদ ভাই’ সম্বোধনে ডাকার মানুষটি আজ নেই, কিন্তু সেই উচ্চারণটি আজও ‘যমুনা’র স্রোত বেয়ে মানুষের চেতনায় রয়ে গেছে।