খুলনা: জুলাই আন্দোলনে শহিদ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ’১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের দ্বিতীয় শাহাদাৎবার্ষিকী উপলক্ষ্যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
শনিবার (১৮ জুলাই) দুপুরে দিবসটি উপলক্ষ্যে মিনিটে সাংবাদিক লিয়াকত আলী মিলনায়তনে ‘জুলাই বিপ্লব থেকে নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. রেজাউল করিমের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খান, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-কেডিএ’র চেয়ারম্যান এ্যাড. এস এম শফিকুল আলম মনা, খুলনা ওয়াসার চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড-বিসিবির পরিচালক শফিকুল আলম তুহিন, শহিদ মীর মুগ্ধ’র পিতা মীর মোস্তাফিজুর রহমান, শহিদ সাকিব রায়হানের পিতা শেখ আজিজুর রহমান, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. হারুনর রশীদ খান ও ট্রেজারার প্রফেসর ড. মো. নূরুন্নবী। স্বাগত বক্তব্য দেন দিবস উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ও ছাত্রবিষয়ক পরিচালক প্রফেসর ড. মো. নাজমুস সাদাত।
আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খান বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থান দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। বাকস্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে আকাঙ্ক্ষা থেকে আন্দোলনের জন্ম, সেই চেতনা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। দেশে যাতে নতুন করে ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা গড়ে না ওঠে এজন্য জুলাই সনদ ও হ্যাঁ ভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে।’
শিক্ষার্থীর দাবি প্রতি সংহতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন আবাসিক হল নির্মাণ সময়ের দাবি।’ সেটির নাম শহিদ মীর মুগ্ধ’র নামে করার বিষয়ে তিনি সহযোগিতার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণে জমি অধিগ্রহণেও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
কেডিএ চেয়ারম্যান এ্যাড. এস এম শফিকুল আলম মনা বলেন, ‘মীর মুগ্ধ’র সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথ উন্মুক্ত করেছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে জুলাই শহিদদের অবদান কখনও ভোলা যাবে না।’
খুলনা ওয়াসার চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ‘একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে যেমন বিতর্ক রয়েছে, তেমনি জুলাইযোদ্ধাদের সংখ্যা নিয়েও যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিতর্কের সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে এখন থেকেই সতর্ক থাকতে হবে।’
বিসিবির পরিচালক শফিকুল আলম তুহিন বলেন, ‘বিলাসী জীবনযাপনের সুযোগ থাকার পরও মীর মুগ্ধ জুলাই আন্দোলনে রাজপথে নেমেছিলেন। আন্দোলন চলাকালে তৃষ্ণার্ত মানুষের মধ্যে পানি বিতরণ করতে গিয়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদাৎ বরণ করেন।’
শহিদ মীর মুগ্ধের পিতা মীর মোস্তাফিজুর রহমান এবং শহিদ সাকিব রায়হানের পিতা শেখ আজিজুর রহমান বক্তব্যে জুলাই আন্দোলনের সময় তাদের সন্তানদের স্মৃতিচারণ করেন। আবেগঘন স্মৃতিচারণায় তারা শহিদদের আত্মত্যাগের কথা তুলে ধরে বলেন, দেশের যেকোনো সংকট ও ক্রান্তিকালে শিক্ষার্থীদের ন্যায়, সত্য ও দেশের স্বার্থে সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।.
সভাপতির বক্তব্যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘শহিদ মীর মুগ্ধ মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও তৃষ্ণার্ত মানুষের হাতে পানি তুলে দিয়েছিলেন। তার এই আত্মত্যাগ তাকে মানবিকতার এক অনন্য প্রতীকে পরিণত করেছে।’
আলোচনা সভায় বক্তারা জুলাই শহিদদের আত্মত্যাগের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তাদের স্বপ্নের বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে শহিদ মীর মুগ্ধ’র স্নাতক পরীক্ষার সনদ তার পিতা মীর মোস্তাফিজুর রহমানের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পাশাপাশি শহিদ মীর মুগ্ধ ও শহিদ সাকিব রায়হানের পরিবারকে সম্মাননা জানানো হয় এবং জুলাই আন্দোলনে আহতদেরও সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।
আলোচনা সভার শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনসংলগ্ন জামে মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম ক্বারী মুস্তাকিম বিল্লাহ। এ সময় জুলাই শহিদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং আহতদের সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনায় দোয়া করা হয়।
এর আগে কর্মসূচির শুরুতে সকাল সাড়ে ১০ টায় অদম্য বাংলা চত্বরে জুলাই আন্দোলনের স্থিরচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। এ সময় অতিথিরা প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া স্থিরচিত্র ঘুরে দেখেন। পরে তারা বৃক্ষরোপণ করেন।
এ সব কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্কুলের ডিন, ডিসিপ্লিন প্রধানসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকতা-কর্মচারী, রাজনৈতিক ও নাগরিক নেতারা, সাংবাদিক এবং সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী ছাত্রবিষয়ক পরিচালক মো. মতিউর রহমান এবং কানিজ ফাতিমা খুশি। এছাড়াও দিবসটি উপলক্ষ্যে বাদ মাগরিব কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।