Thursday 16 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

জুলাইয়ের দিনলিপি / পুলিশের গুলিতে শহিদ হন আবু সাঈদ, আন্দোলন মোড় নেয় গণঅভ্যুত্থানের দিকে

ফারহানা নীলা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১৬ জুলাই ২০২৬ ০৮:২৯

জুলাইয়ের দিনলিপি। ফাইল ছবি

ঢাকা: ঠিক যেন এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি, যা এক নিমেষে বদলে দিল একটি দেশের ইতিহাসের গতিপথ। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাইয়ের তপ্ত দুপুরে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকের সামনে তখন বারুদের গন্ধ। চারদিকে টিয়ারশেল আর পুলিশের মারমুখী অবস্থান। ঠিক সেই মুহূর্তে রণক্ষেত্রের সমস্ত কোলাহল ছাপিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন ২২ বছরের এক তরুণ। তার হাতে কোনো ঢাল ছিল না, ছিল না কোনো তরবারি; ছিল শুধু বুকভরা অসীম সাহস আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অকুতোভয় জেদ। দুই হাত প্রসারিত করে বাতাসের বুকে যেন এক অবিনশ্বর দেয়াল তুলে দাঁড়িয়ে গেলেন তিনি।

পুলিশের উদ্যত শটগানের নলের মুখে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন, ‘আমার গায়ে গুলি চালাতে হলে, সামনাসামনি করো।’ মাত্র ১৫ মিটার দূর থেকে ছুটে আসা শটগানের সীসার বুলেট যখন তার বুক বিদীর্ণ করে দিল, তখন লুটিয়ে পড়লেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। কিন্তু সাঈদের সেই পড়ে যাওয়া আসলে পতন ছিল না, তা ছিল একটি ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ। তার বুকের রক্ত সেদিন পিচঢালা পথ বেয়ে মিশে গিয়েছিল কোটি তরুণের ধমনিতে, আর সেই রক্তিম স্রোতেই রচিত হলো বাংলাদেশের ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়।

বিজ্ঞাপন

বীরের আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধের অমর প্রতীক আবু সাঈদ

১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় আবু সাঈদের সেই দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটি কেবল একটি ভিডিও ফুটেজ ছিল না, তা ছিল স্বৈরাচারী ব্যবস্থার মুখে এক বজ্রকঠিন চপেটাঘাত। কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সাঈদের এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বুক চিরে রক্ত ঝরে পড়ার সেই দৃশ্য দেখে ক্ষোভে, দুঃখে আর অপমানে ফেটে পড়ে গোটা বাংলাদেশ।

আবু সাঈদের এই আত্মত্যাগ আন্দোলনকে আর কেবল সাধারণ ‘কোটা সংস্কারের’ বৃত্তে আটকে রাখেনি, তা রূপান্তরিত হয়েছিল রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক প্রতিরোধে। মাত্র ২২ বছরের এক সাধারণ কৃষকের সন্তান নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন, বুলেটের চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে মানুষের ভেতরের আত্মবিশ্বাস। সাঈদের শাহাদাত বরণের এই ঘটনাটিই মূলত বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয় এবং সাধারণ মানুষকে রাজপথে নেমে আসার অবিনাশী প্রেরণা জোগায়।

সারাদেশে আগুনের লেলিহান শিখা ও রাজপথের প্রতিরোধ

সাঈদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ যেন এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়। উত্তরার জসীমউদ্দিন মোড়, কুড়িল বিশ্বরোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, নতুন বাজার, মেরুল বাড্ডা, বনানী, গাবতলী, মিরপুর রোড, সায়েন্সল্যাব, ধানমন্ডি ২৭ নম্বর, মোহাম্মদপুর থেকে শুরু করে শনিরআখড়া ও সাভারের বিরুলিয়া, প্রতিটি পয়েন্টে শিক্ষার্থীরা রাস্তা অবরোধ করে তীব্র বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রগতি সরণি থেকে শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব থেকে মতিঝিল, সবখানেই মানুষের ঢল নামে।

ভাটারা এলাকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয় ছাত্রলীগ, শুরু হয় দফায় দফায় সংঘর্ষ। শুধু রাজধানী নয়, উত্তাল হয়ে ওঠে চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও বগুড়াও। এদিন চট্টগ্রামে সংঘর্ষে নির্মমভাবে নিহত হন তিনজন, যাদের মধ্যে দু’জন ছিলেন কলেজ শিক্ষার্থী এবং একজন সাধারণ দোকান কর্মচারী। সারা দেশে রেল যোগাযোগ প্রায় ছয় ঘণ্টার জন্য পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে এবং সড়কগুলোতে নেমে আসে এক অভূতপূর্ব স্তব্ধতা। এদিন দেশজুড়ে সংঘর্ষে ঝরে যায় মোট ছয়টি তাজা প্রাণ, যা আন্দোলনের আগুনকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

গায়েবানা জানাজার কর্মসূচি ও ব্যাকফুটে থাকা প্রশাসন

ক্রমেই বাড়তে থাকা এই গণজোয়ার দমনে সরকার আরও কঠোর ও আগ্রাসী রূপ ধারণ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়া, রাজশাহী ও রংপুরে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়। একই সঙ্গে সারা দেশের সব স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়, স্থগিত করা হয় ১৮ জুলাইয়ের এইচএসসি পরীক্ষাও। এমনকি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে এসব দমনমূলক সিদ্ধান্ত আন্দোলনকারীদের দমাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ ও আসিফ মাহমুদের মতো তরুণ ছাত্রনেতারা আন্দোলনের অগ্রভাগে থেকে লড়াই চালিয়ে যান।

হাসনাত আব্দুল্লাহ এই সহিংসতাকে ‘রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট দমন-পীড়ন’ হিসেবে আখ্যা দেন। শিক্ষার্থীরা পরদিন ঢাবির রাজু ভাস্কর্যে কফিন মিছিল ও দেশব্যাপী গায়েবানা জানাজার ঘোষণা দেন। এই তীব্র আন্দোলনের চাপে পড়ে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেন। অন্যদিকে, ১১৪ জন বিশিষ্ট নাগরিক, পাঁচটি শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন এবং ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক ডাকসু নেতারাও এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও বিবৃতি প্রকাশ করেন।

আদালতের তোড়জোড় ও রাজনৈতিক মেরুকরণ

রাজপথ যখন উত্তাল, ঠিক তখন সরকারের নীতি নির্ধারকেরা আইনি ও রাজনৈতিক পথে এই আন্দোলন মোকাবিলার শেষ চেষ্টা করছিলেন। এই উত্তপ্ত দিনেই হাইকোর্টের কোটা বহালসংক্রান্ত রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের চেম্বার কোর্টে সরকারের পক্ষ থেকে ‘লিভ টু আপিল’ (আপিলের অনুমতি) দাখিল করা হয়। অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে জমা দেওয়া এই আবেদনে বলা হয়, কোটা রাখা বা না রাখার বিষয়টি সম্পূর্ণ সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং এতে আদালতের হস্তক্ষেপ করার কোনো সুযোগ নেই। এদিকে, রাজনৈতিকভাবে রাজপথ দখলের জন্য আওয়ামী লীগ তাদের সব নেতাকর্মীদের ১৭ জুলাই সকাল থেকে নিজ নিজ ইউনিট কার্যালয়ে সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশ দেয়।

আন্দোলনে বিএনপির সংহতি

অন্যদিকে, দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে রাজপথের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করে দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের সাধারণ জনগণ ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। দলটির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলও রাজপথে নেমে আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে গায়েবানা জানাজা কর্মসূচি ঘোষণা করে।

একজন সাঈদের মৃত্যু ও লাখো তরুণের জেগে ওঠা

ইতিহাসের চাকা সেদিন থেকেই এক নতুন অভিমুখে ঘুরতে শুরু করেছিল। সেদিন সন্ধ্যায় যখন সাঈদের নিথর দেহখানি তার গ্রামের বাড়ির মাটির কোলে শেষ শয্যা নিচ্ছিল, তখন বাংলার ঘরে ঘরে আরেকটি সূর্যোদয়ের অপেক্ষা শুরু হয়েছিল। বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই একলা তরুণের প্রসারিত দুই হাত আসলে সেদিন কেবল নিজের অধিকার চাননি, তিনি যেন দুই হাত বাড়িয়ে মুক্ত স্বাধীন এক নতুন বাংলাদেশের মানচিত্রকে জড়িয়ে ধরেছিলেন।

১৬ জুলাই তাই আর কোনো সাধারণ ক্যালেন্ডারের পাতা নয়; এটি একটি জাতির ঘুম ভেঙে জেগে ওঠার দিন, অন্যায়ের টুঁটি চেপে ধরে চোখে চোখ রেখে কথা বলার দিন। সাঈদের বুকের রক্তে সেদিন যে আগুন জ্বলে উঠেছিল, তা কেবল তৎকালীন ক্ষমতাকে লণ্ডভণ্ড করেনি, বরং তা হয়ে উঠেছে চিরকালের জন্য শোষণ ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক অবিনাশী ইশতেহার।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর