সিরাজগঞ্জ: একসময় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাটবাণিজ্য ও পাটশিল্পের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল সিরাজগঞ্জ। নদীপথ, রেল ও সড়ক যোগাযোগের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল পাটভিত্তিক বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান। পাট ও পাটজাত পণ্য ঘিরে হাজারো মানুষের জীবিকার আবর্তন ছিল এখানে। ফলে কালের পরিক্রমায় ‘পাট নগরী’ হিসেবে পরিচিত সিরাজগঞ্জে গড়ে ওঠে ‘জাতীয় জুট মিলস লিমিটেড’। এটি শুধু কারখানা নয়, জেলার অর্থনীতি, শ্রমজীবী মানুষের জীবন এবং সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যও জড়িয়ে রয়েছে এর সঙ্গে।
গতকাল (১১ আগস্ট) দেশের অন্য দু’টি পাটকলের সঙ্গে এটিও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা পাটকলটির অর্ধেকেরও বেশি জায়গা ইজারা নিয়েছে বাংলাদেশের বৃহৎ শিল্পগ্রুপ প্রাণ-আরএফএল। তবে ইজারার বিষয়টিকে সাধুবাদ জানালেও এখানে অন্য শিল্পপণ্য উৎপাদনের বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না এখানকার স্থানীয়রা। এই পাটকলের জায়গাটি তৈরি পোশাক, হস্তশিল্প, ব্যাগ, জুতা ও খেলনা উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের পাশাপাশি কাঁচামাল, প্যাকেজিং ও পণ্য সংরক্ষণাগার হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এতে ঐতিহ্য হারাবে এই মিলটিরল। স্থানীয়দের চাওয়া, জাতীয় জুট মিলকে অন্য কোনো শিল্পে নয়, পাটকল হিসেবেই রাখা যায় কি না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইজারার আওতায় আসা পাটকলের জায়গায় প্রায় ৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। সেখানে নিটওয়্যার, ওভেন গার্মেন্টস, ডেনিম পণ্য, জ্যাকেট, ওয়াশিং প্ল্যান্ট, হস্তশিল্প, ব্যাগ, ফুটওয়্যার ও খেলনাসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন- পাটকলের জায়গায় যদি পাটজাত পণ্যই উৎপাদন না হয়, তাহলে ঐতিহাসিক এ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পরিচয় কিভাবে টিকে থাকবে?
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) সিরাজগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক কমরেড নবকুমার কর্মকার সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা হতাশ। নির্বাচনের আগে বিএনপি বন্ধ হয়ে যাওয়া জাতীয় জুট মিলগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এখন ব্যক্তি মালিকানায় চালু করার প্রশ্ন কেন আসছে? আমরা সবসময় দাবি করে আসছি, সিরাজগঞ্জ জাতীয় জুট মিল চালু হলে সেখানে অবশ্যই পাটজাত পণ্য উৎপাদন করতে হবে। পাটের তৈরি পণ্য পরিবেশবান্ধব এবং এর সঙ্গে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে।’
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিষয়টি পূর্ণাঙ্গভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। জাতীয় জুট মিলের জায়গায় এমন পণ্য উৎপাদন হওয়া উচিত, যার সঙ্গে মিলটির ঐতিহ্য ও সিরাজগঞ্জের অর্থনীতির সম্পর্ক রয়েছে। আমরা রাষ্ট্রীয় মালিকানায় মিল পরিচালনা করে পাটজাতপণ্য উৎপাদনের দাবি জানাচ্ছি।’
জাতীয় জুট মিলের ইজারা নিয়ে কথা হয় সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য রুমানা মাহমুদের সঙ্গে। সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলের একাংশ ইজারা নিয়েছে। এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক চুক্তিও হয়েছে। সেখানে কী পণ্য উৎপাদন হবে, সেটা তাদের বিষয়। তবে যেহেতু এখানে পাটকল ছিল, তাই পাটজাত পণ্য তৈরি হলেই ভালো হয়। এতে শ্রমিকদেরও উপকার হবে।’
মিলের শ্রমিক নাসির উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা চাই মিল চালু হোক, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান হোক। তবে যে প্রতিষ্ঠানটি পাটকল হিসেবে পরিচিত, সেখানে পাটের কাজ হলেই আমরা বেশি খুশি হব। আমাদের অনেক শ্রমিকের বকেয়া পাওনা রয়েছে। সেগুলো পরিশোধের পাশাপাশি পাটভিত্তিক উৎপাদন চালু করা হলে পুরোনো শ্রমিকদেরও একটি পরিচয় ফিরে আসবে।’
আরেক শ্রমিক আব্দুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘মিল বন্ধ থাকায় অনেক পরিবার কষ্টে আছে। নতুন করে কাজের সুযোগ তৈরি হলে আমরা অবশ্যই খুশি হব। কিন্তু এই মিলের সঙ্গে পাট ও শ্রমিকদের যে সম্পর্ক, সেটি যেন হারিয়ে না যায়। আমরা চাই এখানে পাটজাত ব্যাগ, বস্তা, দড়ি, কার্পেটসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি হোক। এতে সিরাজগঞ্জের পুরোনো পরিচয়ও ফিরে আসবে।’
স্থানীয়দের মতে, পাটের তৈরি ব্যাগ, বস্তা, দড়ি, কার্পেট, গৃহস্থালি সামগ্রীসহ বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। পাটজাত পণ্য ব্যবহারের পর সহজে প্রাকৃতিকভাবে ক্ষয় হয়ে যায় এবং পরিবেশের ওপর তুলনামূলক কম চাপ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে পাটভিত্তিক শিল্পের সম্প্রসারণ হলে কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা সব পক্ষই উপকৃত হতে পারেন।
তাদের দাবি, নতুন শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি জাতীয় জুট মিলের বিদ্যমান অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে পাট ও পাটজাত বহুমুখী পণ্য উৎপাদন করা হলে সিরাজগঞ্জের হারানো পাটশিল্পের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে। এতে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পাটের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার ও রফতানি দুই ক্ষেত্রেই সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
সিরাজগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা, বন্ধ পাটকল চালুর উদ্যোগ যেন শুধু একটি কারখানা পুনরায় চালুর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং জাতীয় জুট মিলের ঐতিহ্য, শ্রমিকদের স্বার্থ এবং সিরাজগঞ্জের ‘পাট নগরী’ পরিচয় বিবেচনায় নিয়ে এখানে পাট ও পাটজাত পণ্য উৎপাদনের সুযোগ নিশ্চিত করা হোক।