জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের সহ-সভাপতি ডা. জোবায়দা রহমান বলেছেন, ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৮টি জেলার হাসপাতালে কোনো ক্রিটিক্যাল কেয়ার বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) নেই। দেশের ৮০ থেকে ৯০ ভাগ ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট রাজধানী ঢাকায়। প্রত্যেক জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ নিশ্চিত করা এখন জরুরি। আমরা সংকল্প গ্রহণ করলে আর কেউ বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করবে না।
বুধবার (২ জুলাই) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন’-এর ন্যাশনাল কনফারেন্সে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জোবায়দা রহমান বলেন, ‘আমাদের ৬৮ থেকে ৭০ ভাগ মানুষ বাস করে গ্রামাঞ্চলে। তাহলে তারা কীভাবে এই ক্রিটিক্যাল কেয়ারের মতো সেবা পাবে? কেউ অসুস্থ হলে তাদের কীভাবে সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবা প্রদান করা যাবে? নবজাতক শিশু, অন্তঃসত্ত্বা মা, নিউমোনিয়া বা স্ট্রোকে আক্রান্ত বয়োবৃদ্ধ অথবা সড়ক দুর্ঘটনায় আহত তরুণ—সকলেই ক্রিটিক্যাল কেয়ারের অভাবে শীঘ্রই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। কিন্তু নিঃসন্দেহে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব। আমরা সংকল্প গ্রহণ করলে আর কোনো মানুষ গুরুতর শারীরিক অবস্থার সময় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করবে না। সকলে একসাথে কাজ করার মাধ্যমে, সুষ্ঠু পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট কম থাকায় কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকবৃন্দ নিরুপায় হয়ে পড়েন। কিন্তু দেশে স্পেশালিস্ট ইনটেনসিভিস্টদের সংখ্যা কম। অ্যানেসথেটিস্ট, কার্ডিওলজিস্ট, নিউরোলজিস্ট অনেক ক্ষেত্রে ক্রিটিক্যাল কেয়ারের দায়িত্বে থাকেন। এক্ষেত্রে আরও বিশেষজ্ঞ, ট্রেনিং প্রাপ্ত নার্স, বিশেষায়িত ইকুইপমেন্ট, ক্রিটিক্যাল কেয়ারের ইউনিট, ওয়েল-ইকুইপড অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন। যেন গুরুতর অসুস্থ রোগীকে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ক্রিটিক্যাল কেয়ার সম্বলিত হাসপাতালে দ্রুত আনা যায়। শুধুমাত্র তাহলেই আমরা আরও বেশিসংখ্যক রোগীকে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে চিকিৎসা প্রদান করতে পারব।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশ হিসেবে আমরা জনসংখ্যায় বিশাল, কিন্তু সামর্থ্য সীমিত। তবুও এই বাস্তবতায় সঠিক পথ বের করতে হবে গুরুতর আহত অথবা গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসা প্রদান করার জন্য। দূরত্ব ও যানবাহন আরেকটি বিরাট অন্তরায়। অ্যাম্বুলেন্স সুষ্ঠুভাবে প্রস্তুত না থাকলে, তা বরং রোগীদের জীবনের ঝুঁকি বাড়াবে। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ক্রিটিক্যাল কেয়ার প্রদান করতে না পারলেও, অন্তত প্রপারলি ইকুইপড অ্যাম্বুলেন্স দ্বারা রোগীদের সদর হাসপাতালে আনা যায়। সদর হাসপাতালগুলিতে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট নিশ্চিত করা হলে নিশ্চয়ই পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।’
জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের সহ-সভাপতি বলেন, ‘আশা করব আগামীতে ক্রিটিক্যাল কেয়ার চিকিৎসা সেবার অভাবে মৃত্যুর হার যেন আর বেড়ে না যায়। একটি মৃত্যু যেন কোনো পরিবারকে সর্বস্বান্ত না করে, সেজন্য আগামীতে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে নিবিড় পরিচর্যা সেবার পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন।’
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, ‘কয়েকদিন আগে হাসপাতালের বাথরুমে ঢুকতে পারিনি নাক ঢেকেও। সিঁড়িতে বসতে রোগীদের থেকে নিচ্ছে ৫০ টাকা করে। আমাদের দেশে এসব কি মানা যায়? রোগী যদি ছটফট করে কাদে, আর আপনারা বাইরে গল্প করলে কি লাভ হবে? তাই চিকিৎসকদের আরও আন্তরিক হতে হবে।’
অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘এবারই প্রথম ৫৬ বছরের ইতিহাসে সেকেন্ড লার্জেস্ট বাজেট পেয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। অর্থাৎ, মানুষের কল্যাণকে গুরুত্ব দেয় যে দল, সেটি হচ্ছে বিএনপি আর তার প্রয়াত জননেতা আমাদের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।’
তিনি বলেন, ‘আপনাদের বিনীতভাবে অনুরোধ করব, মেডিসিন এমন একটি সাবজেক্ট- একা চলা যায় না। ক্রিটিক্যাল কেয়ার আজকে এই পর্যন্ত এসেছে আলহামদুলিল্লাহ। ক্রিটিক্যাল কেয়ারের অনেক ম্যানপাওয়ার দরকার। একসময় ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি একটা ডিপার্টমেন্ট ছিল, যখন ভাগ করার কথা আসছে অনেকেই মন খারাপ করেছেন। একসময় প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি একটা ডিপার্টমেন্ট ছিল, ভাগ করার কথা এসেছে অনেকে মন খারাপ করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘সার্জারির আন্ডারে রেডিওলজি ছিল, অ্যানেশথেসিওলজি ছিল, সব ছিল সার্জারির আন্ডারে একসময়। কিন্তু আস্তে আস্তে দেশের প্রয়োজনে, মানুষের কল্যাণে বিভাজিত হয়েছে, প্রত্যেকটা সাবজেক্ট নিজস্বভাবে তার প্রস্ফুটিত হয়েছে, তারা আজকে ম্যাচিউরিটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সমস্ত মেডিকেল সাবজেক্টের সবকিছু মিলে হেলথ। অর্থাৎ, ইউ নিড টু বি হেল্পড ফ্রম দ্য অ্যানাটমি ডিপার্টমেন্ট স্টার্টিং আপ টু দি ক্রিটিক্যাল কেয়ার। প্রত্যেকটা ডিপার্টমেন্টের সম্মিলিত ছাড়া হেলথ চলবে না। কাজেই এইরকম মন-মানসিকতা সবার মধ্যে থাকতে হবে। অর্থাৎ, যখন যার সময় আসবে তাকে তার স্পেস দিতে হবে এবং তাকে বড় হওয়ার সুযোগ দিতে হবে।’
চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘চিকিৎসক ভাই এবং বোনেরা, আপনাদের সবাইকে আমি অনুরোধ করব- স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ এবং আমাদের প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথি আছেন, এখানে অনেকেই বিশেষ করে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে চিকিৎসা দিয়েছেন, বিভিন্ন সময়ে দিয়ে যাচ্ছেন এবং দিচ্ছেন। কাজেই সবার কাছে আমার বিনীত অনুরোধ— প্লিজ, আপনারা অনস্টিক চিন্তা করবেন না। ১৮০ মিলিয়ন মানুষ, আগামী ২৫ বছর পরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যকে কীভাবে দেখতে চান— ওই চিন্তা করেন এবং সেটার জন্য প্রস্তুতি নেন। তা না হলে সত্যিকার অর্থে এভাবে ঢাকা শহর কেন্দ্রিক চিকিৎসা আর দুই-চার-পাঁচটা মেডিকেল কলেজে কোর্স কারিকুলাম হবে এবং পড়াশোনা হবে। প্রয়োজনীয়তা মানুষকে তৈরি করে। চেয়ার মেকস আ ম্যান পারফেক্ট। কাজেই আপনাদের মনে রাখতে হবে, একদিনেই সবকিছু হবে না, ইউ নিড টু স্টার্ট ফ্রম টুডে।’
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা. এফএম সিদ্দিকী, বিএসসিসিএমের সভাপতি অধ্যাপক ডা. আরিফ আহসান ও সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. জাফর ইকবাল, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদ ও মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল, স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস ও অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমীমসহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।