ঢাকা: ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইতিহাস নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের ইতিহাস। লড়াইটা চলছে দুই ফ্রন্টে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এবং উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থাপনার। বিশ্ববিদ্যালয় এই দুই কর্তব্যের কোনোটাতেই পিছিয়ে থাকেনি, এবং সেখানেই এর গৌরব।
বুধবার (১ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষ্যে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ।
মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন ইতিহাস এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘অভিযোগ আছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নেমে গেছে। কথাটা একাংশে হয়তো সত্য; তবে অপরাংশে সত্য হলো এটা যে, অন্য সকল ক্ষেত্রের মতোই শিক্ষার মানের ব্যাপারেও বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী কিন্তু আগের শিক্ষার্থীদের তুলনায় বেশি জানে ও বোঝে; তবে তাদের সংখ্যা অধিক নয়। মানের নিম্নগমনের মূল দায়িত্বটা অবশ্য রাষ্ট্রেরই। রাষ্ট্র শিক্ষাকে যখন বিভক্তির মধ্য দিয়ে গেছে, সেখানেই জ্ঞানের এক ধরণের সংকট সৃষ্টি হয়েছে।’
প্রবন্ধে তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন চিত্রটা ছিল মলিন। কেননা, প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে প্রতিবন্ধক ছিল রাষ্ট্র নিজে। রাষ্ট্রের ভাঙা-গড়াতে এবং সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসনের আগমনে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বারবার বিঘ্নিত হয়েছে, শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে গেছে জ্ঞানের চর্চা এবং রাষ্ট্র ও সমাজে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্ব-আরোপিত, দায়িত্ব পালনে।’
তিনি আরও বলেন, “যে আইনের ভিত্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা তাতে বলা হয়েছিল যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ হবে শিক্ষাদান; শিক্ষা বোঝাতে ‘instruction’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছিল; ওই শব্দটি কিন্তু প্রশিক্ষণ বোঝায়, প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষা এক নয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশিক্ষণ দেয়নি, দিয়েছে শিক্ষা, যে শিক্ষা জ্ঞান বৃদ্ধি করে, জগতটাকে বুঝতে এবং তাকে বদলাতে অনুপ্রেরণা জোগায়।’
গবেষণা প্রসঙ্গে মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, ‘অভিযোগ এটাও যে, গবেষণার ক্ষেত্রে অভাব দেখা দিয়েছে। এই অভিযোগ কিন্তু সত্য নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচুর গবেষণা হয়; কিন্তু সকল গবেষণা প্রকাশ পায় না, প্রচারও তেমন ঘটে না, এবং গবেষণার ফল অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে প্রযুক্ত হয় না। গবেষণার পরিমাণ ও উপযোগিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের যতটা নয় তার চেয়ে অধিক রাষ্ট্রব্যবস্থার।’
আলোচনা সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, ‘বিগত ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-ছাত্রীরা যে ভূমিকা রেখেছে, আমার বিশ্বাস আগামী দিনেও গণতন্ত্র এবং উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেভাবে এগিয়ে যাবে।’
তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই উচ্চশিক্ষায় আমাদের বর্তমান প্রশাসনের কিছু প্ল্যান আছে— একাডেমিক ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান। অ্যালামনাইদের সহযোগিতায়, সরকারের সহযোগিতায় আমরা এগিয়ে যাব। বর্তমান সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে জিডিপির দুই পার্সেন্ট বরাদ্দ রেখেছে। আমার বিশ্বাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকার সহযোগিতা করলে শিক্ষা গবেষণায় আমরা সামনের দিকে আরও এগিয়ে যেতে পারব।’
সভাপতিত্বের বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম জাতি গঠনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের ইতিহাস অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কিত। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে এ প্রতিষ্ঠান অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক অগ্রগতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন ইমপ্যাক্ট র্যাঙ্কিংস ২০২৬-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৬০০ ধাপ এগিয়েছে। একই সঙ্গে কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি এবং এশিয়া র্যাঙ্কিংয়েও আমরা শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছি। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও এলসেভিয়ারের যৌথভাবে প্রণীত বিশ্বের শীর্ষ দুই শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫ জন গবেষকের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।’
এর আগে সকাল ১০টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বর থেকে শোভাযাত্রা বের হয়। যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তাসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। এর পর বেলা সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে জাতীয় পতাকা, বিশ্ববিদ্যালয় ও হলগুলোর পতাকা উত্তোলন, কেক কাটা, জাতীয় সংগীত, বিশ্ববিদ্যালয়ের থিম সং এবং রবীন্দ্র ও নজরুল সংগীত পরিবেশন করা হয়।