Thursday 09 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

মূল্যস্ফীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়

সানজিদা যুথী সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
৯ জুলাই ২০২৬ ১৩:১৯

মূল্যস্ফীতি ও ব্যয়।ছবি: সংগৃহীত

দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল সূচকগুলোর একটি হলো মূল্যস্ফীতি। এই সূচক যখন দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ অবস্থানে থাকে, তখন তার প্রভাব কেবল বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকে না; মানুষের জীবনযাত্রা, সঞ্চয়, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও পড়ে। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের অন্যতম বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমেছে, তবুও বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে বলে মনে করছেন অনেক ভোক্তা। সর্বশেষ সরকারি হিসাবে জুন ২০২৬-এ সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯.১৬ শতাংশে নেমেছে, যা মে মাসে ছিল ৯.৪২ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.৬০ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৬১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাজারে স্বস্তি এখনও অধরা

পরিসংখ্যান বলছে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, কিন্তু বাস্তব বাজারচিত্রে সেই স্বস্তি পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। চাল, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ভোজ্যতেল, মসলা, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন ও চিকিৎসা— প্রায় সব ক্ষেত্রেই ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেশি।

বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক ব্যয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে খাদ্য কিনতেই। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদন কিংবা সঞ্চয়ের মতো খাতে ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছে অসংখ্য পরিবার। অনেক পরিবারে মাছ-মাংসের পরিবর্তে কম দামের খাবার বেছে নেওয়া এখন নিয়মিত বাস্তবতা।

কেন বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়?

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্য ওঠানামা

টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানির খরচ বৃদ্ধি

পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি

উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া

সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং কিছু ক্ষেত্রে বাজারে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা ও মজুতদারি

বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি

আয়ের চেয়ে দ্রুত বাড়ছে ব্যয়

মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় নেতিবাচক দিক হলো— মানুষের আয় একই হারে বাড়ছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.১৮ শতাংশ, যা একই সময়ের ৯.১৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। অর্থাৎ প্রকৃত আয় বা ক্রয়ক্ষমতা এখনও কমতির দিকেই রয়েছে।

এর অর্থ, একজন কর্মজীবী ব্যক্তি আগের তুলনায় একই বেতনে কম পণ্য ও সেবা কিনতে পারছেন।
সবচেয়ে বেশি চাপে কারা?

উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব সমাজের সব শ্রেণির মানুষের ওপর পড়লেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—

নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ

স্থির আয়ের চাকরিজীবী

অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি

শহরের ভাড়াটিয়া পরিবার

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী

তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য, বাসাভাড়া ও যাতায়াতে ব্যয় হওয়ায় অন্য খাতে ব্যয় কমিয়ে দিতে হচ্ছে।

মধ্যবিত্তের নীরব সংকট

বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার পরিবর্তন। সামাজিক মর্যাদা রক্ষার কারণে অনেক পরিবার প্রকাশ্যে সংকটের কথা না বললেও বাস্তবে সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাচ্ছে। সন্তানের কোচিং, চিকিৎসা, অবকাশযাপন কিংবা নতুন পোশাক কেনার মতো ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে অসংখ্য পরিবার।

সরকারের পদক্ষেপ

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে। নীতিগত সুদের হার (রেপো রেট) ১০ শতাংশে রাখা হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্য সরবরাহ বাড়ানো, আমদানি সহজ করা এবং বাজার তদারকি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেই সাধারণ মানুষের কষ্ট দূর হবে না। মানুষের প্রকৃত স্বস্তি ফিরবে তখনই, যখন নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকবে, কর্মসংস্থান বাড়বে, মজুরি মূল্যস্ফীতির চেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পাবে এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।

অর্থনীতির ভাষায় মূল্যস্ফীতি কমা একটি ইতিবাচক সংকেত; কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাষায় অর্থনীতির সফলতা তখনই, যখন বাজারে গিয়ে একই আয়ে আগের মতোই প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা সম্ভব হবে। তাই মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াই কেবল একটি অর্থনৈতিক সূচক কমানোর বিষয় নয়, বরং মানুষের জীবনমান ও ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের লড়াই।

বিজ্ঞাপন

আরো

সানজিদা যুথী - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর