Monday 29 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

কঠোর মুদ্রানীতিতেও মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে

‎স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২৯ জুন ২০২৬ ২১:৪৬

বাংলাদেশ ব্যাংক। ফাইল ছবি

ঢাকা: সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, উচ্চ নীতিসুদ এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালুর মতো একাধিক পদক্ষেপ নেওয়ার পরও দেশে মূল্যস্ফীতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে এবং ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের চাপ আরও বেড়েছে।

তবে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। কৃষি ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধির কারণে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদের ইউনিট প্রকাশিত ‘মনিটারি পলিসি রিভিউ ২০২৫–২৬’-এ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির এমন চিত্র উঠে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দামের চাপ এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রাথমিক হিসাবে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি বেড়ে ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশে উঠেছে। তবে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি কমে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমেছে। শিল্পে উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে দুর্বল রফতানি, কমে যাওয়া অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে দায়ী করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি

বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের জুনে ছিল ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির চাপ শুধু খাদ্যেই নয়, পুরো অর্থনীতিতেই বিস্তৃত হয়েছে। যদিও ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশে নেমেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারে প্রতিযোগিতার ঘাটতি, দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থা, বাজার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যমূল্য বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।

নীতিসুদ ১০ শতাংশেই বহাল

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নীতিসুদ ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটির (এসএলএফ) সুদহার ১১ দশমিক ৫ শতাংশ রাখা হলেও স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটির (এসডিএফ) সুদহার ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে, যাতে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে তারল্য বাড়ে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কিছুটা গতি পায়। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে আরও নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়েছে।

বেসরকারি ঋণপ্রবাহে রেকর্ড নিম্নগতি

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের এপ্রিল শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যের অনেক নিচে এবং সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ঋণচাহিদা কমে যাওয়া, ব্যাংকগুলোর সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

রেমিট্যান্সে স্বস্তি, রিজার্ভ বেড়েছে

অন্যদিকে বৈদেশিক খাতে ইতিবাচক অগ্রগতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয়, বাণিজ্য ঋণ বৃদ্ধি এবং আমদানি নিয়ন্ত্রিত থাকায় চলতি হিসাবের ঘাটতি কমেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করেছে।

ব্যাংক খাতে বাড়ছে ঝুঁকি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে তারল্য পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও খেলাপি ঋণ বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে মোট খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা এক বছর আগে ছিল ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশ। এতে ব্যাংকগুলোর মুনাফা ও মূলধন সক্ষমতার ওপর চাপ বেড়েছে এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে সতর্কতা

বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যবাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এতে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে জ্বালানি, খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে রফতানি, বৈদেশিক বাণিজ্য ও রেমিট্যান্সেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আগামী অর্থবছরের লক্ষ্য

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের কাঠামোগত সংস্কার, আর্থিক ও মুদ্রানীতির সমন্বিত বাস্তবায়ন, ৬০ হাজার কোটি টাকার বেসরকারি খাত উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান কর্মসূচি এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হলে আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হতে পারে। তবে এর জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা ধরে রাখাকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সারাবাংলা/এসএ/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর