ঢাকা: সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে তিন বছর আগে নিখোঁজ হওয়া অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মো. আশরাফুল ইসলামকে অপহরণের পর হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ভিকটিম আশরাফুলের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক ছিল রফিকুলের। এ সময়ে আশরাফুল তার আরও দুই বন্ধুকে নিয়ে একজন যৌনকর্মীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি রফিকুলের কাছে অত্যন্ত অপমানজনক ও ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একপর্যায়ে সেই ক্ষোভ থেকেই আশরাফুলকে হত্যা করে রফিকুল।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকেলে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান এই তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে তিন বছর আগে নিখোঁজ হওয়া অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মো. আশরাফুল ইসলামকে অপহরণের পর হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে সিআইডি। এ ঘটনায় এজাহারনামীয় আসামি মো. রফিকুল ইসলামকে (৫৪) গ্রেফতার করেছে সিআইডির সিরাজগঞ্জ জেলা ইউনিট। গত ১২ আগস্ট দুপুর ১টার দিকে শাহজাদপুর থানার জামিরতা বাজার এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।’
জসীম উদ্দিন বলেন, ‘২০২৩ সালের ৩১ আগস্ট সন্ধ্যার পর রফিকুল মোবাইলফোনে আশরাফুলকে একাধিকবার ফোন করে বাড়ি থেকে ডেকে জামিরতা বাজারে নিয়ে যান। এরপর আশরাফুল আর বাড়িতে ফিরে আসেনি। রাতে পরিবারের সদস্যরা তার অপেক্ষায় থাকলেও সে বাড়িতে না ফেরায় বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করে। পরদিন তার মোবাইলফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটিও বন্ধ পাওয়া যায়। আত্মীয়-স্বজনসহ সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও আশরাফুলের সন্ধান না পাওয়ায় তার বাবা শাহজাদপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। আশরাফুলের নিখোঁজের পর তার পরিবারের সদস্যরা রফিকুলের কাছে গিয়ে জানতে চাইলে রফিকুলের অবস্থান ও কথাবার্তায় তারা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। দীর্ঘদিন ধরে আশরাফুলের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় পরে তার মা মোছা. নাসিমা খাতুন ওই বছরের ১৩ নভেম্বর বিজ্ঞ আদালতে তিনজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে আদালত মামলাটির তদন্তভার সিআইডি সিরাজগঞ্জ-এর ওপর ন্যস্ত করেন।’
তিনি বলেন, ‘মামলাটি ছিল আপাত ক্লু-লেস শিশু অপহরণ মামলা। দীর্ঘদিন তদন্ত করেও ভিকটিমের অবস্থান বা তার সঙ্গে কী ঘটেছে সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। পরবর্তীতে মামলার তদন্তভার এসআই (নিরস্ত্র) মো. আজমল হোসেনের ওপর অর্পিত হলে সিআইডি, সিরাজগঞ্জের বিশেষ পুলিশ সুপার জনাব মোনালিসা বেগমের নির্দেশনায় তদন্তের গতিপথে নতুন মাত্রা যোগ হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার আরজি পুনঃবিশ্লেষণের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ এবং স্থানীয়ভাবে গোপন ও প্রকাশ্য তদন্ত শুরু করেন। তদন্তের একপর্যায়ে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য ও ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র পাওয়া যায় এবং এজাহারনামীয় ১ নম্বর আসামি মো. রফিকুল ইসলামের ভূমিকা বিশেষভাবে সামনে আসে। মামলাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও চাঞ্চল্যকর হওয়ায় অধিকতর নিবিড় তদন্তের স্বার্থে তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে মামলাটি পিটিশন মামলা থেকে নিয়মিত এফআইআর হিসেবে শাহজাদপুর থানায় রুজুর আবেদন করেন।’
জসীম উদ্দিন বলেন, ‘এরই ধারাবাহিকতায় গত ১২ আগস্ট দুপুরে শাহজাদপুর থানাধীন জামিরতা বাজার এলাকা থেকে এজাহারনামীয় আসামি মো. রফিকুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদে আশরাফুলের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার অন্তরালে থাকা চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। জিজ্ঞাসাবাদে রফিকুল জানান, ভিকটিম আশরাফুলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ শারীরিক সম্পর্ক ছিল। তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা অবস্থায় রফিকুল জানতে পারেন যে, আশরাফুল তার আরও দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে একজন যৌনকর্মীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়েছে। বিষয়টি রফিকুলের কাছে অত্যন্ত অপমানজনক ও ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একপর্যায়ে সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি আশরাফুলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।’
সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘটনার দিন রফিকুল মোবাইলফোনে আশরাফুলকে ডেকে যমুনা নদীর পাড়ে নিয়ে যান। সেখানে যৌন-উত্তেজক ট্যাবলেট দেওয়ার কথা বলে রফিকুল কৌশলে আশরাফুলকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ান। ওষুধের প্রভাবে আশরাফুল অচেতন হয়ে পড়লে রফিকুল তাকে যমুনা নদীর পানিতে ফেলে দেন। পরে নদীর স্রোতে আশরাফুলের দেহ ভেসে যায় বলে জিজ্ঞাসাবাদে রফিকুল জানান। রফিকুল ইসলাম পরবর্তীতে স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন।’
তিনি বলেন, ‘রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে এর আগেও গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার ইতিহাস রয়েছে। প্রায় ৭-৮ বছর আগে উল্লাপাড়া থানা এলাকায় মন্টু মিয়া নামের এক ব্যক্তির বাড়িতে তাঁতের কাজে সহযোগিতা করার সময় সেই ব্যক্তির বড়ো ছেলে শাহিনের সঙ্গে রফিকুলের অনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয় বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। পরবর্তীতে শাহিনের বিয়ের বিষয়ে জানতে পেরে রফিকুল ক্ষুব্ধ হয়ে একপর্যায়ে ঘুমন্ত অবস্থায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে শাহিনের পুরুষাঙ্গের অংশবিশেষ কেটে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় মন্টু মিয়া বাদী হয়ে ২০১৫ সালের ২৩ জুন শাহজাদপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ রফিকুলের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে এবং বিচারিক কার্যক্রম শেষে তিনি সাত বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে সাজা ভোগ করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিআইডির তদন্তে আশরাফুলকে অপহরণের আড়ালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটিত হলেও ভিকটিমের মরদেহ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। রফিকুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এবং সম্ভাব্য অন্যান্য উৎস থেকে মরদেহের সন্ধান অব্যাহত রয়েছে। যমুনা নদীর ভাটি অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে অজ্ঞাতনামা মরদেহ সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছে এবং সরেজমিনে সংশ্লিষ্ট থানার রেজিস্ট্রার ও নথিপত্র যাচাই করা হচ্ছে। ভিকটিমের মরদেহ উদ্ধার, আসামির দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা উদঘাটনে সিআইডির তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’