Thursday 21 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

কোরবানির বাজার
রংপুরের ১২ হাজার কোটি টাকা লেনদেনের সম্ভাবনা

রাব্বী হাসান সবুজ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২১ মে ২০২৬ ০৮:০৯ | আপডেট: ২১ মে ২০২৬ ১১:০১

কোরাবানির হাটে তোলার জন্য প্রস্তুত ষাঁড়। ছবি: সারাবাংলা

রংপুর: ঈদুল আজহা সামনে রেখে রংপুর বিভাগের হাট-বাজারগুলোতে জমে উঠেছে কোরবানির পশুর বেচাকেনা। প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যfনুযায়ী, এ বছর বিভাগে সাড়ে ১৫ লাখ পশু কোরবানি হতে পারে। এতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। শুধু পশুই নয়, মসলা, লবণ, চামড়া ও নতুন পোশাকও এই অর্থনীতিতে যুক্ত হয়ে এই অঞ্চলের চালিকাশক্তিকে আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উত্তরবঙ্গের এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে স্থানীয় পশু উৎপাদন। একসময় যেখানে সীমান্ত পথ ধরে চোরাই পশুতে নির্ভর করতে হতো, সেখানে এখন উন্নত পশুপালন পদ্ধতি ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের সহায়তায় স্থানীয় খামারিরাই বাজারের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হচ্ছেন। বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য বলছে, এ বছর বিভাগটিতে চাহিদার চেয়ে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ বেশি পশু প্রস্তুত রয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতির শক্ত অবস্থানেরই ইঙ্গিত বহন করে।

বিজ্ঞাপন

হাটে হাটে পশুর দর কেমন?

রংপুর নগরীর লালবাগ, বুড়িরহাটসহ কয়েকটি পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, ছোট আকারের গরু ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকা, মাঝারি আকারের গরু ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং বড় আকারের গরু আড়াই লাখ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে বড় আকারের গরুর তুলনায় ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদাই বেশি।

প্রাণিসম্পদ দফতর সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ঈদুল আজহায় রংপুর বিভাগের আট জেলায় প্রায় ১৫ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিল। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে সাড়ে ১৫ লাখে পৌঁছাতে পারে। মোট পশুর এক-তৃতীয়াংশ গরু এবং বাকি দুই-তৃতীয়াংশ খাসি-ছাগল বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। সেই হিসাবে এবার বিভাগে ৫ লাখ গরু এবং ১০ লাখ খাসি-ছাগল কোরবানি হতে পারে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি গরুর গড় মূল্য দেড় লাখ টাকা হিসেবে ধরলে ৫ লাখ গরুর বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে, প্রতিটি খাসি ও ছাগল বিক্রি হচ্ছে ১২ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকায়। গড়ে প্রতিটি ছাগলের দাম ১৫ হাজার টাকা হিসেবে ধরলে ১০ লাখ ছাগলের বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা।

পশুর সঙ্গী অন্যান্য খাত

শুধু পশু ক্রয়-বিক্রয়ই নয়, কোরবানি ঘিরে লবণ, মসলা ও চামড়ার মতো অনুষঙ্গী খাতগুলিতেও বিরাট অঙ্কের লেনদেন হয়, যা স্থানীয় বাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সক্রিয় করে তোলে। মসলার বাজারের তথ্যানুযায়ী, প্রতিটি কোরবানির পশুর জন্য গড়ে ৫০০ টাকার মসলা প্রয়োজন হয়। সে হিসাবে মসলা কেনাবেচায় যুক্ত হতে পারে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।

এদিকে লবণের চাহিদাও বেশি। একটি গরুর চামড়া সংরক্ষণে প্রায় আট কেজি এবং একটি ছাগলের চামড়া সংরক্ষণে প্রায় তিন কেজি লবণ লাগে। গড়ে ছয় কেজি হিসেবে হিসাব করলে চামড়া সংরক্ষণে ১০ লাখ কেজির বেশি লবণের প্রয়োজন হবে। প্রতিকেজি লবণের দাম ৩৫ টাকা ধরে এ খাতে কয়েক কোটি টাকার ব্যবসা হবে।

চামড়ার বাজারেও বড় অঙ্কের লেনদেনের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিটি গরুর চামড়া গড়ে এক হাজার টাকা করে বিক্রি হলে ৫ লাখ গরুর চামড়া থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকা আসবে। আর ছাগলের চামড়া প্রতিটি দেড়শ থেকে ২০০ টাকা দরে বিক্রি হলে সেখান থেকে ১৫ কোটির বেশি টাকা আসতে পারে।

খামারি ও কর্মসংস্থানে প্রভাব

কোরবানির এই অর্থনীতি শুধু ব্যবসায়ীদের নয়, আর্থিকভাবে স্বচ্ছলতা এনে দিচ্ছে প্রান্তিক খামারিদের সংসারেও। বুধবার (২০ মে) রংপুর নগরীর লালবাগ হাটে আমিনুল ইসলাম একটি গরু বিক্রি করেছেন ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায়। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘সারা বছর গরু লালন-পালন করেছি, কোরবানির ঈদে বিক্রি করার জন্য। গরু বিক্রির টাকা দিয়ে সংসারের বাড়তি খরচ মেটাব।’

প্রাণিসম্পদ দফতরের তথ্যানুযায়ী, বিভাগের ১ লাখ ৯৭ হাজার ৪১৪ জন ছোট-বড় খামারি এরই মধ্যে ২০ লাখের বেশি গবাদিপশু প্রস্তুত করেছেন। এই বিশাল অঙ্কের লেনদেন খামারি থেকে শুরু করে পশুখাদ্য বিক্রেতা, শ্রমিক ও পরিবহণ শ্রমিকসহ হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে।

চ্যালেঞ্জ ও সতর্কতা

তবে সম্প্রতি কিছু অভিযোগ উঠেছে যে, লাভের আশায় কিছু খামারি পশু মোটাতাজাকরণে স্টেরয়েড ও হরমোনজাতীয় ওষুধ ব্যবহার করছেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। পশু কেনার সময় ক্রেতাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বছর চোরাই পথে পশু অনুপ্রবেশ রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা স্থানীয় খামারিদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করবে।

রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের বিভাগীয় পরিচালক ডা. মোহাম্মদ আব্দুল হাই সরকার সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ বছর কোরবানির ঈদে রংপুর বিভাগের অর্থনীতিতে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি যোগ হতে পারে। এর মধ্যে শুধু গবাদিপশু খাতেই প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হবে।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর