কক্সবাজার: রাত তখন প্রায় সাড়ে ১১টা। কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে একের পর এক ঢুকছেন পর্যটকেরা। কারও বমি হচ্ছে, কেউ তীব্র পেটব্যথায় কাতরাচ্ছেন। আবার কেউ ডায়রিয়ায় দুর্বল হয়ে পড়েছেন। হাসপাতালের করিডোরজুড়ে উদ্বিগ্ন স্বজন ও সহপাঠীদের ছোটাছুটি।
শুক্রবার (১৫ মে) গভীর রাতে এমন দৃশ্যের জন্ম দেয় কক্সবাজার শহরের বহুল পরিচিত আল-গণি রেস্টুরেন্টে খাবার খাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়া অন্তত ৩০ পর্যটক। অসুস্থ হওয়া পর্যটকেরা সবাই রাজশাহী টিচার্স ট্রেনিং কলেজের শিক্ষা সফরের সদস্য। ১৩০ জনের একটি দল ভ্রমণে কক্সবাজারে আসেন। সৈকত ভ্রমণের আনন্দঘন দিন শেষে রাতে তারা শহরের সুগন্ধা পয়েন্টের আল-গণি রেস্টুরেন্টে বারবিকিউ খেতে যান।
শিক্ষক দলের সদস্যরা জানিয়েছেন, খাবার খাওয়ার কিছু সময় পর থেকেই একজন-দু’জন করে অসুস্থ বোধ করতে শুরু করেন। প্রথমে বিষয়টিকে সাধারণ সমস্যা বলে মনে হলেও ধীরে ধীরে প্রায় সবাই একই ধরনের উপসর্গে আক্রান্ত হন। শুরু হয় বমি, ডায়রিয়া ও তীব্র পেটব্যথা। পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকলে রাতেই তাদের দ্রুত কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. তানবী জান্নাত জানিয়েছেন, ‘রাত সাড়ে ১১টার পর থেকে আক্রান্ত পর্যটকরা হাসপাতালে আসতে শুরু করেন। সবমিলিয়ে একটি গ্রুপের ৩০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ফুড পয়জনিংয়ের উপসর্গ দেখা গেছে।’
তার ভাষ্য, চিকিৎসকরা তাৎক্ষণিক স্যালাইন, ওষুধ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। কয়েক ঘণ্টার চিকিৎসা শেষে শনিবার দুপুরের দিকে শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে পর্যটকদের হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
অসুস্থদের মধ্যে ছিলেন গোলাম মোর্শেদ, মাহবুব আলম, আব্দুল মোমিন, মৌ, রুমা, আসমানী, মরিয়ম, মোমেন, মশিউর রহমান, মাসুম বিল্লাহ, আনোয়ার, সাবাব উল্লাহ, জাহির, আমিনুল ইসলাম, আজহারুল আলী, কামরুজ্জামান, আবু বকর, গীতা বালা ধরসহ আরও অনেকে।
রাজশাহী টিচার্স ট্রেনিং কলেজের শিক্ষক আব্দুল মোমিন আক্ষেপ নিয়ে জানিয়েছেন, ‘আমরা আনন্দ নিয়ে শিক্ষা সফরে এসেছিলাম। কিন্তু রাতে খাবার খাওয়ার পর হঠাৎ সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল।’
এদিকে, ঘটনার খবর পেয়ে শনিবার বিকেলে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে অভিযান চালায় আল-গণি রেস্টুরেন্টের সুগন্ধা পয়েন্ট শাখায়। অভিযানে খাবার তৈরির স্থান অস্বাস্থ্যকর ও অপরিচ্ছন্ন পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। একইদিন শহরের হোটেল সি প্যালেসের রেস্টুরেন্টেও অভিযান চালিয়ে আরও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হাসান আল মারুফ এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা শুভ্র দাশ বলেছেন, ‘অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। প্রোপার হাইজিন মেইনটেইন না করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। খাবার তৈরির পরিবেশও সন্তোষজনক ছিল না।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে আল-গণি রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত এক বিবৃতিতে তারা দাবি করেছে, তাদের রেস্টুরেন্টের খাবার নয়, বরং সৈকত এলাকার অন্য কোনো খাবার খেয়ে পর্যটকেরা অসুস্থ হয়েছেন।
কিন্তু প্রশাসনের অভিযানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের প্রমাণ মেলার পর প্রশ্ন উঠেছে, কক্সবাজারের জনপ্রিয় রেস্টুরেন্টগুলোতে আদৌ স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কি না।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলামের মতে, প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো পর্যটক কক্সবাজারে আসেন। সৈকতের পাশাপাশি এখানকার বার্মিজ খাবার, বারবিকিউ ও সামুদ্রিক খাবারের প্রতি পর্যটকদের আগ্রহও ব্যাপক। ফলে শহরজুড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল ও রেস্টুরেন্ট। কিন্তু পর্যটন খাতের দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।
ভুক্তভোগী পর্যটক মশিউর রহমানের বলেন, ‘কক্সবাজার দেশের সবচেয়ে বড় পর্যটন শহর। এখানে খাবারের মান নিয়ে নিয়মিত মনিটরিং না থাকলে এমন ঘটনা আরও বাড়বে। এতে পর্যটকদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে।’