Monday 25 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ভালোবাসার নামে শুধু ব্যবহারই হচ্ছেন না তো?

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২৫ মে ২০২৬ ১৮:৫৯

সম্পর্ক মানেই তো দুজনের দুটি হাত এক হয়ে জীবনের কঠিন পথটা মসৃণ করে নেওয়া, যেখানে থাকবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমতা আর এক বুক ভালোবাসা। কিন্তু অনেক সময় আমরা অজান্তেই এমন এক গোলকধাঁধায় পা দিয়ে ফেলি, যেখানে ভালোবাসার পবিত্র আড়ালে লুকিয়ে থাকে চরম স্বার্থপরতা আর মানসিক শোষণ। আপনি হয়তো আপনার সঙ্গীর প্রতিটি ছোট-বড় ইচ্ছাকে পূরণ করতে নিজের ক্যারিয়ার, নিজের ভালো লাগা, এমনকি নিজের আত্মসম্মান পর্যন্ত বিসর্জন দিয়ে দিচ্ছেন। অথচ দিনশেষে যখন আপনার নিজের একটু মানসিক সমর্থনের প্রয়োজন হয়, তখন চারপাশটা কেমন যেন শূন্য আর মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করে ওঠে। মনস্তত্ত্ববিদেরা একে বলেন ‘ইমোশনাল এক্সপ্লয়েটেশন’ বা ভালোবাসার নামে ব্যবহার হওয়া। এই ধরণের সম্পর্কে একজন মানুষ শুধু দিয়েই যান, আর অন্যজন কোনো দায়বদ্ধতা ছাড়াই তা কেবল ভোগ করে যান। আপনি যদি প্রতিনিয়ত এই ধরণের একপাক্ষিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যান, তবে এখনই সময় একটু থমকে দাঁড়ানোর এবং ঠান্ডা মাথায় ভাবার—আপনি যাকে নিজের পৃথিবী ভাবছেন, সে আপনাকে সত্যিই ভালোবাসে তো, নাকি কেবল নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করছে?

বিজ্ঞাপন

প্রয়োজনের ফর্দ যখন ভালোবাসার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে

একটি সুস্থ সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ বা পারস্পরিক আদান-প্রদান; কিন্তু আপনি যখন কোনো সম্পর্কে কেবল ব্যবহৃত হতে থাকেন, তখন সেই সম্পর্কের সমীকরণটা পুরোপুরি বদলে যায়। একটু খেয়াল করলেই দেখতে পাবেন, আপনার সঙ্গী আপনার সাথে তখনই সবচেয়ে মিষ্টি করে কথা বলে, যখন তার কোনো বিশেষ আর্থিক, সামাজিক বা মানসিক সাহায্যের প্রয়োজন হয়। তার মন খারাপের দিনে, ক্যারিয়ারের সংকটে বা একাকীত্ব দূর করতে আপনাকে ঠিকই ২৪ ঘণ্টা পাশে পাওয়া যায়; কিন্তু আপনার কোনো কঠিন সময়ে যখন তাকে পাশে দরকার হয়, তখন সে হুট করেই খুব ‘ব্যস্ত’ হয়ে পড়ে কিংবা নানা অজুহাতে আপনাকে এড়িয়ে চলে। সম্পর্কের এই একপাক্ষিক ব্যস্ততা আর অবহেলা কিন্তু কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়, এটি একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত যে আপনি তার জীবনে কোনো বিশেষ ভালোবাসার মানুষ নন, বরং অত্যন্ত সহজলভ্য একটি ‘অপশন’ বা মাধ্যম মাত্র। যখন কোনো মানুষের কাছে আপনার উপস্থিতির চেয়ে আপনার কাছ থেকে পাওয়া সুযোগ-সুবিধাগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে হবে ভালোবাসার সুতোটা আসলে শোষণের রূপ নিয়েছে।

অপরাধবোধের ফাঁদ এবং নিজের ওপর বিশ্বাসের সংকট

টক্সিক বা ব্যবহার করার মানসিকতাসম্পন্ন সঙ্গীদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো ‘গ্যাসলাইটিং’ এবং কথায় কথায় আপনাকে অপরাধী বানিয়ে দেওয়া। আপনি যখনই তাদের কোনো অন্যায় আবদার বা আচরণের বিরুদ্ধে নিজের কণ্ঠ তুলবেন, তখনই তারা এমন এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে যাতে দিনশেষে দোষটা আপনার ঘাড়েই এসে পড়ে। “তুমি আমাকে আর আগের মতো ভালোবাসো না” কিংবা “তুমি বড্ড স্বার্থপর হয়ে গেছ” এই ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ব্লেম-গেম খেলে তারা আপনার মনে তীব্র অপরাধবোধ বা ‘গিল্ট ট্রিপ’ তৈরি করে দেয়। এর ফলে আপনি নিজের আত্মবিশ্বাস হারাতে শুরু করেন এবং তাদের খুশি করতে আরও বেশি উন্মুখ হয়ে ওঠেন, যা তাদের শোষণের পথকে আরও বেশি প্রশস্ত করে দেয়। একটা সময়ে গিয়ে আপনার মনে হতে থাকে, সঙ্গীর সব অন্যায় মেনে নেওয়াই বোধহয় আপনার পবিত্র দায়িত্ব; আর এই মানসিক দাসত্বই একজন মানুষকে সম্পর্কের ভেতরে ভেতরে আক্ষরিক অর্থেই নিঃশেষ করে ফেলে।

সম্পর্কের সীমানা নির্ধারণ এবং নিজের ‘না’ বলতে শেখার শক্তি

এই ধরণের আত্মঘাতী চক্র থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম এবং প্রধান ধাপ হলো সম্পর্কের ভেতরে একটি শক্ত দেয়াল বা ‘বাউন্ডারি’ তৈরি করা। নিজেকে ভালোবাসতে শেখা কোনো স্বার্থপরতা নয়, বরং এটি আপনার মানসিক সুস্থতার জন্য একটি অত্যন্ত জরুরি লড়াই। আপনার সঙ্গী যদি আপনার তৈরি করা সীমানা বা আপনার ‘না’ বলাকে সহজভাবে নিতে না পারে এবং এর জন্য আপনার ওপর রাগ বা মানসিক চাপ সৃষ্টি করে, তবে বুঝে নেবেন সে আসলে আপনার ব্যক্তিত্বকে নয়, আপনার সহজলভ্যতাকে ভালোবাসত। একজন মানুষকে মন থেকে ভালোবাসার মানে এই নয় যে তার সব ধরণের অন্যায় আবদার বা শোষণকে আপনাকে হাসিমুখে মেনে নিতে হবে। নিজের ভালো লাগা, নিজের স্বপ্ন আর নিজের আত্মসম্মানকে সবার আগে অগ্রাধিকার দিতে শিখুন, কারণ যে মানুষটি নিজেকে শ্রদ্ধা করতে জানে না, তাকে অন্য কেউ কোনোদিন শ্রদ্ধা করতে পারে না।

সারাবাংলার বিশেষ পরামর্শ: শূন্যতা কাটিয়ে নতুন ভোরের সন্ধান

যে সম্পর্ক আপনাকে শান্তি দেওয়ার বদলে প্রতিদিন একটু একটু করে মানসিক অবসাদের দিকে ঠেলে দেয়, সেই মরীচিকার পেছনে ছুটে চলা বন্ধ করার নামই জীবন। সম্পর্ক ভাঙা অবশ্যই অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক, কিন্তু একটি টক্সিক সম্পর্কের ভেতর থেকে প্রতিদিন তিলে তিলে মরে যাওয়ার চেয়ে সেই মেকি ভালোবাসার হাতটা ছেড়ে দেওয়া অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ। সারাবাংলা.নেটের লাইফস্টাইল ডেস্কের পক্ষ থেকে পাঠকদের উদ্দেশ্যে এটাই বলার যে, একা থাকা কোনো পাপ বা পরাজয় নয়, বরং এটি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার এক চমৎকার সুযোগ। আপনার জীবন এবং আপনার আবেগ অত্যন্ত মূল্যবান, তাই এটিকে এমন কোনো মানুষের হাতে সঁপে দেবেন না যে এর মূল্য বোঝে না। আজই নিজের ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তুলুন, একপাক্ষিক শোষণের বেড়াজাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসুন এবং এমন একটি জীবনের দিকে পা বাড়ান যেখানে আপনার ভালোবাসার বিনিময়ে আপনি পাবেন সমান শ্রদ্ধা, যত্ন আর সত্যিকারের এক টুকরো নিরেট সুখ।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর