Monday 25 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

মেঠো পথ থেকে বৈশ্বিক মঞ্চে পৃথিবীর উৎসব: আজ বিশ্ব ফুটবল দিবস

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২৫ মে ২০২৬ ১৫:১৫

‘দাই দাই ইকো, দালে আলে লেটস গো!’

পপ সম্রাজ্ঞী শাকিরা আর নাইজেরিয়ান তারকা বার্না বয়ের নতুন ফুটবল অ্যান্থেম ‘দাই দাই’ (Dai Dai – We’re Ready) এর এই বিদ্যুদ্বেগী সুর যখন স্পিকার চিরে ফুটবলপ্রেমীদের কানে আছড়ে পড়ে, তখন বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শিহরণ জাগে। ফুটবল মানেই তো এই, জন্মলগ্ন থেকে অব অবিনাশী এক টান, শত পতনের পর ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে গোলপোস্টের জাল কাঁপানোর আদিম এক ক্ষুধা।

শাকিরার এই নতুন গানটি যেমন ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রাক্কালে পুরো বিশ্বের স্টেডিয়াম কাঁপাতে শুরু করেছে, ঠিক তেমনি আজ ২৫ মে তারিখে এসে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের আবেগ, চোখের জল আর বাঁধভাঙা উল্লাসের এই খেলাটি এক অনন্য আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নিয়েছে। আজ সেই জাদুকরী উন্মাদনাকে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে কুর্নিশ জানানোর দিন, আজ বিশ্ব ফুটবল দিবস।

বিজ্ঞাপন

সারা পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা ফুটবলপ্রেমীদের এক সুতোয় বাঁধার জন্য, মেঠো পথের ধুলোবালি থেকে শুরু করে আধুনিক নিয়ন আলোর সবুজ গালিচার উন্মাদনাকে সম্মান জানাতেই আজকের এই আয়োজন। শাকিরার গানের প্রতিটি লাইনের মতোই ফুটবল আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মাঠের লড়াইটা আসলে জীবনেরই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি যেখানে শেষ বাঁশি বাজার আগের সেকেন্ড পর্যন্ত ভাগ্য বদলানোর সুযোগ থাকে।

জাতিসংঘের সেই ঐতিহাসিক রেজোলিউশন

ফুটবল তো আমরা প্রতিদিনই খেলি, প্রতিদিন টিভির পর্দায় চোখ রেখে প্রিয় দলের জন্য রাত জেগে গলা ফাটাই, তাহলে হঠাৎ এই ২৫ মে তারিখটিকেই কেন বেছে নেওয়া হলো বৈশ্বিক উদযাপনের জন্য? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের ইতিহাসের পাতায় ঠিক ১০২ বছর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে, ১৯২৪ সালের ২৫ মে তারিখে। সেবার ফ্রান্সের প্যারিস অলিম্পিক গেমসে ইতিহাসের প্রথমবারের মতো বিশ্বের সব অঞ্চলের প্রতিনিধি দেশগুলোর অংশগ্রহণে একটি বৈশ্বিক ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা ফুটবলের আধুনিক রূপরেখাকে আমূল বদলে দেয়। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে এবং ফুটবলের অভূতপূর্ব সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিতে ২০২৪ সালের ৭ মে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তৎকালীন সাধারণ পরিষদের সভাপতি ডেনিস ফ্রান্সিসের বলিষ্ঠ উদ্যোগে এবং বিশ্বের ১৬০টিরও বেশি দেশের সরাসরি সমর্থনে পাস হয় ‘এ/আরইএস/৭৮/২৮১’ (A/RES/78/281) নম্বর রেজোলিউশন, যা প্রতি বছরের ২৫ মে তারিখটিকে অফিশিয়ালি ‘বিশ্ব ফুটবল দিবস’ বা ‘World Football Day’ হিসেবে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠা করে। জাতিসংঘ তাদের দাপ্তরিক সনদে স্পষ্ট করেই বলেছে যে ফুটবল কোনো সাধারণ সস্তা বিনোদন নয়, এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শান্তি বিনির্মাণ, লৈঙ্গিক সমতা এবং বৈশ্বিক কূটনীতির এক অবিচ্ছেদ্য ও শক্তিশালী মাধ্যম যা খুব সহজেই বিভিন্ন বৈরী সংস্কৃতির মধ্যে বন্ধুত্বের সেতু তৈরি করতে পারে।

ফুটবল: শান্তির এক অনন্য আন্তর্জাতিক ভাষা

জাতিসংঘের এই বিশ্বব্যাপী ঘোষণার পেছনে কাজ করেছে ফুটবলের সেই অলৌকিক এক জাদুকরী শক্তি, যা পৃথিবীর কোনো রাজনৈতিক দল, মহাশক্তিধর রাষ্ট্রনেতা বা সামরিক জোট আজ পর্যন্ত করে দেখাতে পারেনি। ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ানি ইনফান্তিনো নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরে বিশ্ব ফুটবল দিবসের এক বিশেষ অধিবেশনে এসে একটি অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে আমাদের বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটে অত্যন্ত জটিল এবং কঠিন একটি সময় পার করছে, যেখানে পদে পদে বর্ণবাদ, বিভেদ আর সংঘাত মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। এই কঠিন সময়ে মানবজাতির বড় প্রয়োজন একটি উসিলা, সবাইকে একই ছাদের নিচে এনে এক করার একটি অকাট্য বাহানা; আর ফুটবল হলো সেই মোক্ষম উসিলা যা মানুষকে আনন্দ দেয়, আশা জাগায় এবং মুহূর্তের মধ্যে পুরো বিশ্বকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলে। লিবিয়া, বাহরাইন এবং তাজিকিস্তানের মতো দেশগুলোর যৌথ কূটনৈতিক উদ্যোগে আয়োজিত এই বিশেষ বৈশ্বিক দিবসের মূল সুরই হলো সমতা এবং নিয়মের প্রতি পরম শ্রদ্ধা। ফুটবল আমাদের নিখুঁতভাবে শেখায় যে মাঠে যেমন ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে লাভ নেই—নিয়ম ভাঙলে রেফারি লাল কার্ড দেখাতে দ্বিধা করেন না, ঠিক তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বড়-ছোট, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাইকে একই নিয়ম মেনে চলতে হবে, তবেই পৃথিবীতে প্রকৃত শান্তি ও সহাবস্থান বজায় রাখা সম্ভব।

মেঠো পথ থেকে বাঙালি নারীদেরও ফুটবল জয়

আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এবং গুগল ট্রেন্ডসের সাম্প্রতিক ডেটার দিকে যদি আমরা একটু গভীরভাবে চোখ ফেরাই, তবে দেখতে পাবো ফুটবল কীভাবে এদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক একটি সাধারণ মেয়ের জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। সানজিদা আক্তার, মারিয়া মাণ্ডা কিংবা রূপনা চাকমাদের মতো কলসিন্দুরের মেঠো পথ ও পাহাড়ের প্রতিকূলতা থেকে উঠে আসা মেয়েরা আজ যখন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট মাথায় পরে, তখন ফুটবল কেবল ৯০ মিনিটের একটি খেলা থাকে না, সেটি হয়ে ওঠে নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক মুক্তির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। জাতিসংঘও তাদের মূল নীতিমালায় এই বিষয়টি বিশেষভাবে যুক্ত করেছে যে ফুটবলকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি (SDG) অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের শারীরিক-মানসিক বিকাশ এবং লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণে এই খেলার কোনো বিকল্প নেই। এক টুকরো চামড়ার বলকে ঘিরে যে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার একটি সুবিধাবঞ্চিত শিশু, সেই স্বপ্নই তাকে জীবনের বড় বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ, দারিদ্র্য আর কুসংস্কার জয় করার বুকভরা সাহস জোগায়।

ওয়ার্ল্ড ফুটবল উইকের মহোৎসব এবং পুরো পৃথিবীর এক হয়ে যাওয়ার গল্প

বিশ্ব ফুটবল দিবস উপলক্ষে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা (FIFA) এবার কেবল একটি দিন নয়, বরং পুরো সপ্তাহ জুড়ে ‘ওয়ার্ল্ড ফুটবল উইক’ বা বিশ্ব ফুটবল সপ্তাহ উদযাপনের ডাক দিয়েছে, যা ২৩ মে থেকে শুরু হয়ে ২৫ মে পর্যন্ত নানা বর্ণাঢ্য কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী একযোগে পালিত হচ্ছে। এর মূল এবং একমাত্র উদ্দেশ্য হলো পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তের মানুষকে, সে মেসি-রোনালদোর মতো পেশাদার বিশ্বসেরা তারকা খেলোয়াড় হোক কিংবা পাড়ার গলির প্লাস্টিকের বলে শট নেওয়া আনাড়ি কিশোর ফুটবলার—সবাইকে মাঠে নামানো এবং একটি সুস্থ, মাদকমুক্ত জীবনযাপনের জন্য শারীরিক কার্যকলাপে উদ্বুদ্ধ করা। ফুটবল এমন এক চিরন্তন বিশ্বজনীন ভাষা যা বুঝতে কোনো ডিকশনারির প্রয়োজন হয় না, কোনো ব্যাকরণ বা অনুবাদের দরকার পড়ে না। ব্রাজিলের ফাবেলার বস্তি থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনার চিলতে গলি, আফ্রিকার তপ্ত মরুভূমি থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বর্ষণমুখর কাদা-মাঠ, সবখানেই ফুটবল এক পরম মুক্তি আর নিরেট আনন্দের নাম। গোলপোস্টের জাল কাঁপিয়ে বুক চিরে বেরিয়ে আসা সেই অতি পরিচিত আদিম চিৎকার….গোওওওল……!

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর