টাঙ্গাইল: পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে কম খরচে বাড়ি ফেরার জন্য যাত্রীবাহী বাসের পরিবর্তে রডবোঝাই ট্রাকে উঠেছিলেন একদল শ্রমিক। সেই যাত্রায় টাঙ্গাইল পৌঁছলে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ১৫ জন শ্রমিক। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৯ জন।
সোমবার (২৫ মে) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের যমুনা সেতু সংযোগ সড়কের কালিহাতী উপজেলার সরাতৈল দক্ষিণপাড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নোয়াখালী থেকে উত্তরবঙ্গের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা রডবোঝাই ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে খাদে পড়ে গেলে হতাহতের এ ঘটনা ঘটে।
নিহত ১৫ জনের মধ্যে ১২ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন- নওগাঁর মান্দা উপজেলার সাকিম মিয়ার ছেলে মো. সাগর মিয়া (২০), একই এলাকার শহিদুল ইসলামের ছেলে রবিউল ইসলাম (২৫), রাজশাহীর তানুর উপজেলার আলতাফ হোসেনের ছেলে ইসমাইল হোসেন (১৯), চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার নজরুল (৬০), চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মামুন (৪৫), নওগাঁর নেয়ামতপুর উপজেলার সাইদুলের ছেলে সারিকুল (২৫), নওগাঁর মান্দা উপজেলার আব্দুর রশিদের ছেলে মো. বারিক (২১), একই উপজেলার আব্দুর রহিমের ছেলে বাদশা (৩২), নওগাঁর পাকুরিয়া গ্রামের রশিদের ছেলে গিয়াস (২০), একই এলাকার রশিদের ছেলে মাইনুল (২৮), জেলার রাজেন্দ্রবাটি এলাকার একাব্বর আলীর ছেলে ইয়াকুব (২০) ও একই এলাকার সুলতানের ছেলে তারেক (২০)। বাকি ৩ জনের পরিচয় পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় আহতরা হলেন- নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার ডেমরা গ্রামের মজিবরের ছেলে বাবু (৩৫), শহিদুলের ছেলে সমেজ (২১), হোসেনপুর গ্রামের আব্দুল রহিমের ছেলে আব্দুল রহমান (৩৫), দশপাড়া গ্রামের নজরুলের ছেলে তুহিন (২৪), পাকুরিয়া গ্রামের সফেদ আলীর ছেলে আলমগীর (৪০), ছোরহাব আলীর ছেলে সিদ্দিক আলী (৪০), রাজেন্দ্রবাড়ী গ্রামের মৃত সাহেব আলীর ছেলে খোরশেদ (২৬), নাটোরের গুরুদাসপুরের নয়ন বিশ্বাস (২২) এবং পাবনা জেলার আমিনপুর উপজেলার নওয়াবাড়ী গ্রামের আতোয়ারের ছেলে শেখ রতন (৩৫)|
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, ভোর সাড়ে ৪ টার দিকে বিকট শব্দ পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান তারা। সেখানে আহতদের আর্তনাতে আকাশ ভারি হয়ে আসে। আশপাশের বাড়ি থেকে শাবল এনে রড সরিয়ে তাদেরকে বের করা হয়। এ সময় একে একে ১৫ জনের মরদেহ বের করে তারা। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার কাজ সম্পন্ন করে।
স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল রানা জানান, বিকট শব্দে ঘুম ভাঙ্গে তার। বাইরে চিৎকার শুনে ঘটনাস্থলে যান। পরে কোদাল ও শাবলের দিয়ে রড সরিয়ে আহত ও নিহতদের বের করা হয়। এমন দুর্ঘটনা কখনো দেখি নাই। একসঙ্গে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত নওগাঁর মান্দা উপজেলা আব্দুল রহিমের ছেলে আব্দুল রহমান জানান, হঠাৎ করেই ট্রাকটি দুলতে শুরু করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেটি উলটে যায়। এরপর চারদিকে চিৎকার-আর্তনাদ শুরু হয়। অনেকেই ট্রাকের নিচে চাপা পড়েন।
টাঙ্গাইলের (অতিরিক্ত) পুলিশ সুপার ফৌজিয়া হাবিব জানান, চট্রগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা রড বোঝাইট্রাক যাত্রী নিয়ে উত্তরবঙ্গের দিকে যাচ্ছিল। এ সময় ট্রাকটি ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মযুনা সেতু সংযোগ সড়কের কালিহাতীর সরাতৈল এলাকায় পৌঁছালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যমুনা সেতু সংযোগ মহাসড়কের পাশে খাদে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই ১৫ জন নিহত হয়। আহতদের উদ্ধার করে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। নিহতদের বাড়ি রাজশাহী, নওগাঁ ও চাপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দুপুর ১২টার দিকে নিহত ও আহতের স্বজনরা টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ছুটে আসতে থাকে। এ সময় স্বজনহারানোদের কান্নায় হাসপাতাল চত্বর ভারি হয়ে ওঠে।
নিহত সাগর মিয়া এর চাচাতো বোন মলিনা আক্তার বলেন, আমার চাচাতো ভাই মারা গেছে। গত প্রায় ছয়মাস আসে সাগর বিয়ে করেছে। তার বাড়ি নওগা জেলার মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাড়ি গ্রামে। নোয়াখালিতে সাগর ভাঙ্গারীর ব্যবসা করতো। আমাদের ঈদ আনন্দ আর নেই। সরকারিভাবে সহযোগিতা পেলে আমাদের মতো গরীব মানুষের অনেক উপকার হয়।
নিহতের স্বজনরা আরও জানান, নিহত ও আহতরা সকলেই নোয়াখালী জেলার চৌমহনী এলাকায় ভাঙ্গারি মোবাইল ফোন ফেরী করে ক্রয় করে জীবিকা নির্বাহ করতো। ঈদ-উল-আযহা উপলক্ষ্যে ফেনী জেলার মহিপাল থানা এলাকা থেকে জনপ্রতি ৫৫০ টাকা ভাড়ায় রড ভর্তি ট্রাকে উঠে বাড়ির উদ্দেশে।
টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাদিকুর রহমান জানান, টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ১৫ জনের মরদেহ আনা হয়। আহত অবস্থায় ৯ জনকে ভর্তি হয়। এরমধ্যে চিকিৎসা নিয়ে ৪ জন চলে গেছে। বাকি ৫ জন হাসপাতাল চিকিৎসাধীন রয়েছে। একজনের অবস্থা আশংকাজনক।
টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক শরীফা হক জানান, দুর্ঘটনার পর থেকেই নওগাঁ জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হয়। মরদেহ বিশেষ ব্যবস্থায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়ার পাশপাশি আহতদের সুচিকিৎসাসহ সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে।