ভূমিকম্প এমন এক আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা মুহূর্তের মধ্যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির পরও ভূমিকম্পের নিখুঁত সময় ও স্থান আগে থেকে জানা সম্ভব নয়। তবে আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে কম্পন শুরু হওয়ার কয়েক সেকেন্ড থেকে আধ মিনিট আগে ফোনে একটি সতর্কবার্তা বা অ্যালার্ট পাওয়া সম্ভব। আর জরুরি মুহূর্তে এই সামান্য সময়টুকুই জীবন বাঁচাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
আসুন জেনে নেই , ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা ফোনে পাওয়ার উপায়…
অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের জন্য গুগল নিয়ে এসেছে ‘অ্যান্ড্রয়েড আর্থকোয়াক অ্যালার্টস সিস্টেম’ (Android Earthquake Alerts System)। এই ফিচারটি ফোনে চালু থাকলে, আপনার এলাকায় ভূমিকম্প আঘাত হানার কয়েক সেকেন্ড আগেই স্ক্রিনে সতর্কতা চলে আসবে।
গুগলের এই সিস্টেমটি যেভাবে কাজ করে
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনে ‘অ্যাক্সিলেরোমিটার’ (Accelerometer) নামের একটি বিশেষ সেন্সর থাকে, যা ফোনের নড়াচড়া বা কম্পন বুঝতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় যখন একসঙ্গে অনেকগুলো ফোনে একই ধরনের কম্পন তৈরি হয়, তখন গুগলের সার্ভার স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা বিশ্লেষণ করে ভূমিকম্পের তীব্রতা ও কেন্দ্রবিন্দু নির্ধারণ করে। এরপর ক্ষণিকের মধ্যে ওই এলাকার ও তার আশেপাশের সব অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীর ফোনে একটি জরুরি মেসেজ বা অ্যালার্ট পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ফোনে যেভাবে ‘Earthquake Alerts’ চালু করবেন
আপনার অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনে এই ফিচারটি সক্রিয় করতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন…
১. প্রথমে ফোনের Settings-এ যান।
২. স্ক্রল করে নিচের দিকে গিয়ে Safety & Emergency অথবা Location অপশনে ট্যাপ করুন।
৩. সেখানে Earthquake Alerts নামক একটি অপশন পাবেন, সেটিতে ক্লিক করুন।
৪. ফিচারটি বন্ধ (Off) থাকলে তা Turn On বা এনাবল করে দিন।
নোট: ফোনের ব্র্যান্ড ও মডেলভেদে (যেমন- Samsung, Xiaomi, Realme) এই অপশনটি সেটিংসের ভেতর Advanced Settings বা Security & Privacy-এর ভেতরেও থাকতে পারে। খুঁজে না পেলে সেটিংসের সার্চ বারে “Earthquake” লিখে সার্চ করতে পারেন।
এই ফিচারটি সচল রাখতে যা যা জরুরি
গুগলের এই সুবিধাটি পেতে হলে আপনার ফোনে ৪টি বিষয় সবসময় চালু থাকতে হবে…
ফোনে সার্বক্ষণিক ইন্টারনেট সংযোগ (Wi-Fi বা Mobile Data) থাকতে হবে।
ফোনের লোকেশন (GPS) অন থাকতে হবে।
আপনার ফোনের Google Play Services অ্যাপটি আপ-টু-ডেট থাকতে হবে।
ফোনটি সচল অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমে চলতে হবে।
গুগল মূলত দুই ধরনের সতর্কতা পাঠায়
বি অ্যাওয়ার অ্যালার্ট (Be Aware Alert): ভূমিকম্পের মাত্রা কম হলে এই নোটিফিকেশনটি আসে। এতে ফোন ভাইব্রেট হয় এবং ব্যবহারকারীকে সাবধান থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
টেক অ্যাকশন অ্যালার্ট (Take Action Alert): কম্পনের মাত্রা বেশি ও ভয়াবহ হলে এটি আসে। তখন ফোন ‘সাইলেন্ট’ বা ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ মুডে থাকলেও পুরো স্ক্রিন জুড়ে লাল রঙের সতর্কবার্তা ভেসে ওঠে এবং খুব উচ্চস্বরে অ্যালার্ম বাজতে থাকে। এই অ্যালার্ট পাওয়ার সাথে সাথে দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হবে।
আইফোন (iOS) ব্যবহারকারীরা কী করবেন?
গুগলের এই বিল্ট-ইন ফিচারটি মূলত অ্যান্ড্রয়েডের জন্য। তবে আইফোন ব্যবহারকারীরা অ্যাপল-এর নিজস্ব ‘Government Alerts’ বা স্থানীয় সরকারি জরুরি সতর্কবার্তা অন রাখতে পারেন (যদি তা সংশ্লিষ্ট দেশে চালু থাকে)। এছাড়া অ্যাপ স্টোর থেকে বিশ্বস্ত কোনো থার্ড-পার্টি আর্থকোয়াক ট্র্যাকার অ্যাপ ইনস্টল করে নোটিফিকেশন অন রাখতে পারেন।
সতর্কবার্তা পাওয়ার পর করণীয়
ফোনে ভূমিকম্পের অ্যালার্ম বাজার সাথে সাথে আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত মাথায় নিচের পদক্ষেপগুলো নিন…
ড্রপ, কভার অ্যান্ড হোল্ড অন: ঘরের ভেতরে থাকলে দ্রুত কোনো মজবুত টেবিল, খাট বা ডেস্কের নিচে আশ্রয় নিন এবং শক্ত করে ধরে রাখুন।
কাচের জানালা, আলমারি বা ভারী আসবাবপত্র থেকে দূরে থাকুন।
বহুতল ভবনে থাকলে নামার জন্য কোনো অবস্থাতেই লিফট ব্যবহার করবেন না।
যদি বাইরে থাকেন, তবে ভবন, বৈদ্যুতিক খুঁটি, বড় গাছ ও ফ্লাইওভার থেকে দূরে কোনো খোলা জায়গায় চলে যান।
গাড়ি চালানো অবস্থায় থাকলে দ্রুত নিরাপদ কোনো ফাঁকা স্থানে গাড়ি থামিয়ে ভেতরেই অপেক্ষা করুন।
ভূমিকম্প রোধ করা মানুষের সাধ্যের বাইরে, তবে প্রযুক্তির এই ছোট সুবিধাটি ব্যবহার করে আমরা জীবন ও সম্পদের ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারি। তাই অবহেলা না করে আজই আপনার ফোনের সেটিংসটি চেক করে নিন।