Sunday 28 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

‘সকালে যেখানে ছিল বসতভিটা, বিকেলেই সেখানে নদী’

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৮ জুন ২০২৬ ২০:০৪ | আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬ ২০:১৯

যমুনায় বিলীন হওয়ার অপেক্ষায় সরকারি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শেষ অবকাঠামো। ছবি: সংগৃহীত

সিরাজগঞ্জ: উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অব্যাহত পানি বৃদ্ধিতে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদী ফের ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীর স্রোত তীব্র হয়ে ওঠায় জেলার নদীতীরবর্তী সদর, কাজিপুর ও চৌহালী উপজেলায় দেখা দিয়েছে ব্যাপক ভাঙন।

গত কয়েকদিনের ভাঙনে শতাধিক বসতবাড়ি, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গাছপালা ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের কবলে পড়ে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছে অন্যত্র। নদী তীরের মানুষজন এখন চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

স্থানীয়রা জানান, যমুনার আগ্রাসী ভাঙনে প্রতিদিনই বদলে যাচ্ছে নদীর তীরবর্তী এলাকার চিত্র। সকালবেলা যে জায়গায় বসতভিটা ছিল, বিকেলেই সেখানে দেখা মিলছে নদীর পানি। অনেকে ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার সুযোগও পাচ্ছেন না। ভাঙন আতঙ্কে নদীপাড়ের মানুষ নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সিরাজগঞ্জ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রোববার (২৮ জুন) সকাল ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি সদর পয়েন্টে তিন সেন্টিমিটার বেড়েছে। বর্তমানে পানি বিপৎসীমার ১৪৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে কাজিপুর পয়েন্টে পানি বেড়েছে ছয় সেন্টিমিটার। সেখানে পানি বিপৎসীমার ১৯৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এদিকে সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের বাহুকা এলাকায় যমুনার ডান তীর রক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। সেখানে ভাঙন নিয়ন্ত্রণে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পাউবো।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘যমুনায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছু কিছু এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙন নিয়ন্ত্রণে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলা হচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

কাজিপুর উপজেলার চর গিরিশ চরে নদীভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। একসময় এ চরে প্রায় ৬০০ পরিবারের বসবাস ছিল। কিন্তু কয়েক দফা নদীভাঙনে অনেক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, গত ১০ দিনে অন্তত ৩০টি পরিবার নতুন করে গৃহহীন হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, চর গিরিশ এলাকায় আরও শতাধিক পরিবারের বসতভিটা যেকোনো সময় নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অপরদিকে চৌহালী উপজেলার বাগুটিয়া ইউনিয়নের চর সলিমাবাদ, ভূতের মোড়, বিনানুই ও ভুসুরিয়া চরাঞ্চলে প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত ১০ থেকে ১৫ দিনের ভাঙনে বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, বেসরকারি স্কুল ও দোকানপাটসহ অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

স্থানীয়রা বাসিন্দারা বলছেন, নদী আমাদের সব কেড়ে নিচ্ছে। ঘর সরানোর আগেই নদী কাছে চলে আসে। অনেকেই পরিবার নিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলা হলেও অনেক জায়গায় তা টেকসই হচ্ছে না। তারা দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।

চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুরুল আমিন বলেন, ‘ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা করে সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।’

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কাওয়াকোলা ইউনিয়নের বর্ণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও যমুনার ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে এলাকার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এছাড়া বেলকুচি ও শাহজাদপুর উপজেলার নদীতীরবর্তী ও চরাঞ্চলের মানুষের মাঝেও ভাঙন আতঙ্ক বিরাজ করছে।

নদীভাঙনের পাশাপাশি এসব এলাকার আবাদি জমির ফসল তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় মানুষ নৌকা ছাড়া চলাচল করতে পারছেন না। কৃষকরা বলছেন, জমি হারানোর পাশাপাশি ফসল নষ্ট হওয়ায় তারা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

যমুনার এই আগ্রাসী রূপে সিরাজগঞ্জের নদীতীরবর্তী মানুষের জীবন এখন অনিশ্চয়তার মুখে। তাদের একটাই দাবি নদীভাঙনের স্থায়ী সমাধান এবং নিরাপদ বসবাসের নিশ্চয়তা।