Tuesday 09 Jun 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

পোকামাকড়হীন দেশ!

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
৯ জুন ২০২৬ ১৭:৩৪

আমরা যেখানেই যাই না কেন; ঘরের কোণ হোক, রান্নাঘর হোক বা কোনো গভীর জঙ্গল; পোকামাকড় যেন আমাদের ছায়ার মতো সঙ্গী। মশা, মাছি, পিঁপড়ে কিংবা মাকড়সার যন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য আমরা কত কিছুই না করি। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই পৃথিবীতেই এমন কিছু অবিশ্বাস্য জায়গা রয়েছে যেখানে পোকামাকড়ের কোনো রাজত্ব নেই? এটি কোনো রূপকথা বা কল্পবিজ্ঞান নয়, বরং সম্পূর্ণ বাস্তব। প্রকৃতির নিজস্ব কিছু নিয়মের কারণে পৃথিবীর নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল কীটপতঙ্গের জন্য একেবারেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠেছে। আজ আমরা ঘুরে আসব পৃথিবীর সেইসব বিচিত্র এবং জাদুকরী প্রান্তে, যেখানে গেলে আপনাকে মশার কামড় খেতে হবে না বা কোনো উইপোকার আনাগোনা দেখতে হবে না।

বিজ্ঞাপন

অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ

দক্ষিণ মেরুর এই জমাট বাঁধা বরফের মহাদেশটি যেন পৃথিবীর বুকে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন গ্রহ। অ্যান্টার্কটিকাকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক, ঠান্ডা এবং ঝড়ো আবহাওয়ার অঞ্চল। এখানকার তাপমাত্রা এতটাই নিচে নেমে যায় যে সাধারণ কোনো কীটপতঙ্গের পক্ষে সেখানে বেঁচে থাকা অলৌকিক ঘটনার শামিল। পোকামাকড়ের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন আর্দ্রতা, খাদ্য এবং একটি নির্দিষ্ট মাত্রার তাপমাত্রা, যার একটিও অ্যান্টার্কটিকায় মিলবে না। তবে মজার বিষয় হলো, পুরো মহাদেশে বেলজিকা অ্যান্টার্কটিকা (Belgica antarctica) নামের এক ধরনের বিশেষ ডানাহীন মাছি পাওয়া যায়, যা মাত্র ২ থেকে ৬ মিলিমিটার লম্বা হয়। এটি ছাড়া অন্য কোনো মাছি, মশা, পিঁপড়ে বা মাকড়সা এই বিশাল বরফের রাজ্যে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। ফলে আপনি যদি পোকামাকড় থেকে চিরতরে মুক্তি চান, তবে অ্যান্টার্কটিকার চেয়ে নিরাপদ জায়গা আর দ্বিতীয়টি নেই।

আগ্নেয়গিরির দেশ আইসল্যান্ড

ইউরোপের একটি সুন্দর ও স্বনামধন্য দ্বীপরাষ্ট্র আইসল্যান্ড, যা তার চমৎকার প্রাকৃতিক দৃশ্য, জলপ্রপাত আর আগ্নেয়গিরির জন্য বিখ্যাত। কিন্তু এই দেশের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ লুকিয়ে আছে এর বায়ুমণ্ডলে, এখানে কোনো মশা নেই। স্কটল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড কিংবা অ্যান্টার্কটিকার অন্যান্য ঠান্ডা অঞ্চলে যেখানে মশার উপদ্রব দেখা যায়, সেখানে আইসল্যান্ড সম্পূর্ণ মশামুক্ত। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন যে, আইসল্যান্ডের অদ্ভুত ও পরিবর্তনশীল জলবায়ুই এর মূল কারণ। এখানকার আবহাওয়া এতটাই দ্রুত পরিবর্তিত হয় যে, শীতকালে হঠাৎ বরফ গলে পানি হয়ে যায় এবং তার পরদিনই আবার তীব্র ঠান্ডায় সবকিছু জমে যায়। মশার ডিম পাড়া এবং সেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার জন্য যে স্থিতিশীল পরিবেশের প্রয়োজন, তা আইসল্যান্ডের প্রকৃতিতে একদমই অনুপস্থিত। ফলে মশার জীবনচক্র এখানে এসে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে এবং আইসল্যান্ডবাসী মশার কামড় কাকে বলে তা না জেনেই জীবন কাটিয়ে দেয়।

ফারো দ্বীপপুঞ্জ

আইসল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডের মাঝামাঝি উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত ফারো দ্বীপপুঞ্জ যেন এক টুকরো স্বর্গ। এই দ্বীপপুঞ্জের আবহাওয়া এবং ভৌগোলিক অবস্থান এতটাই অনন্য যে এখানেও মশার কোনো অস্তিত্ব নেই। তীব্র ঠান্ডা বাতাস এবং সাগরের লবণাক্ত আবহাওয়ার কারণে মশা বা সাধারণ ক্ষতিকর পোকামাকড় এখানে বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। দ্বীপটির চারপাশের তীব্র বাতাস যেকোনো উড়ন্ত পোকাকে উড়িয়ে সাগরে ফেলে দেয়। তবে এখানে কিছু সাধারণ মাছি বা মাটির নিচের ছোট পোকা দেখা গেলেও, মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলার মতো কোনো ক্ষতিকর বা বিষাক্ত পোকামাকড়ের উপদ্রব এখানে একেবারেই নেই। এখানকার মানুষজন ঘরের জানালা সারাদিন খোলা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন, কারণ ভেতরে কোনো জোনাকি বা মশা ঢোকার ভয় থাকে না।

ট্রিস্টান ডানিহা

পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম এবং মূল ভূখণ্ড থেকে দূরবর্তী মানববসতি হলো দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের ট্রিস্টান ডানিহা দ্বীপ। এই দ্বীপটি এতটাই বিচ্ছিন্ন যে এর সবচেয়ে কাছের মূল ভূখণ্ড দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে এর দূরত্ব প্রায় আঠারোশো মাইল। ভৌগোলিক এই চরম দূরত্বের কারণে পৃথিবীর মূল ভূখণ্ডের কোনো সাধারণ পোকামাকড় আজ পর্যন্ত এই দ্বীপে পৌঁছাতে পারেনি। প্রাকৃতিকভাবেই এই দ্বীপে মশা, বিষাক্ত মাকড়সা কিংবা ডানাওয়ালা উপদ্রব সৃষ্টিকারী কোনো কীটপতঙ্গ নেই। এখানকার আদি বাসিন্দারা বা গবেষকরা যখন বাইরে থেকে কোনো মালামাল আনেন, তখন কঠোরভাবে পরীক্ষা করা হয় যেন কোনো পোকা জাহাজের মাধ্যমে দ্বীপে প্রবেশ করতে না পারে। প্রকৃতির এই কঠোর সুরক্ষাকবচের কারণে ট্রিস্টান ডানিহা আজও পৃথিবীর বুকে এক শান্ত এবং পোকামাকড়হীন অনন্য আশ্রয়স্থল হয়ে টিকে রয়েছে।

পোকামাকড়হীন পৃথিবীর ভবিষ্যৎ এবং আমাদের ভাবনা

পোকামাকড় ছাড়া একটি জীবন কল্পনা করতে আমাদের হয়তো বেশ ভালোই লাগে, কিন্তু প্রকৃতির ভারসাম্যের কথা চিন্তা করলে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। যেসব চরম ভাবাপন্ন অঞ্চলে কীটপতঙ্গ নেই, সেখানে পরিবেশের এক ভিন্ন ধরনের রূপ গড়ে উঠেছে। তবে আমরা যেখানেই থাকি না কেন, মশা-মাছির উপদ্রব আমাদের যতই বিরক্ত করুক, এই পুঁচকে জীবগুলোই কিন্তু পৃথিবীর খাদ্যশৃঙ্খল ও পরাগায়নের মূল চালিকাশক্তি। তাই অ্যান্টার্কটিকা বা আইসল্যান্ডের মতো বিশেষ কিছু অঞ্চলের কীটপতঙ্গহীন এই জাদুকরী রূপ যেমন আমাদের বিস্মিত করে, তেমনি এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টির পেছনেই রয়েছে কোনো না কোনো গভীর রহস্য ও নিখুঁত পরিকল্পনা। হয়তো এই কারণেই, পৃথিবীর এই সামান্য কয়েকটি ব্যতিক্রমী জায়গা আজও ভ্রমণপিপাসু ও গবেষকদের কাছে এক পরম বিস্ময় হয়ে টিকে আছে।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর