Wednesday 29 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

আনা ব্রাকাস: অপতথ্যের গোলকধাঁধায় এক নির্ভীক পথপ্রদর্শক

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৯:৩৯

ডিজিটাল দুনিয়ার বিশাল গোলকধাঁধায় যখন তথ্যের জোয়ার বইছে, তখন সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য করাটা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। এই কঠিন সময়ে অন্ধকারের বিপরীতে এক আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়িয়েছেন ক্রোয়েশিয়ার নির্ভীক সাংবাদিক আনা ব্রাকাস। তিনি কেবল একজন সংবাদকর্মী নন, বরং তিনি সেই মানুষ যিনি তথ্যের বিশুদ্ধতা রক্ষায় নিজের জীবন ও মানসিক শান্তিকে বাজি রেখেছেন। ক্রোয়েশিয়ার একমাত্র স্বীকৃত ও স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা ‘ফ্যাক্টোগ্রাফ’ (Faktograf)-এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে তিনি আজ বিশ্বজুড়ে অপতথ্য প্রতিরোধের এক অগ্রসেনানী।

পেশা নয় দায়বদ্ধতা

আনা ব্রাকাসের সাংবাদিকতা বা তথ্য-যাচাইয়ের এই যাত্রাটি কেবল একটি পেশা নয়, বরং একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা। ফ্যাক্টোগ্রাফ মূলত ক্রোয়েশিয়ার রাজনীতি, অর্থনীতি এবং জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর নির্ভুলতা যাচাই করে। আনা মনে করেন, একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য নাগরিকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি। যখনই কোনো রাজনৈতিক নেতা ভুল তথ্য দেন বা ইন্টারনেটে কোনো ক্ষতিকর গুজব ছড়ায়, আনার নেতৃত্বে ফ্যাক্টোগ্রাফের দলটি সেটি ব্যবচ্ছেদ করে সত্যটা সামনে নিয়ে আসে।

বিজ্ঞাপন

তবে এই পথ চলাটা আনার জন্য মোটেও মসৃণ ছিল না। যারা অপতথ্য ছড়িয়ে ফায়দা লুটতে চায়, তাদের কাছে আনা ব্রাকাস ও তার প্রতিষ্ঠান সবসময়ই চক্ষুশূল। কাজের কারণে তাকে এবং তার সহকর্মীদের নিয়মিত ডিজিটাল হয়রানি, এমনকি সরাসরি হুমকির সম্মুখীন হতে হয়েছে। কিন্তু আনা দমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি বিশ্বাস করেন, সত্য প্রকাশের এই লড়াইয়ে ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

আনা ব্রাকাস ও সত্যের লড়াই

সম্প্রতি ব্রাসেলসে আর্টিকেল নাইনটিন, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা এবং ইউরোপীয় জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনায় আনা ব্রাকাস তার দীর্ঘ লড়াইয়ের মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই সভায় তিনি যে বাস্তবতার চিত্র এঁকেছেন, তা কেবল ক্রোয়েশিয়ার নয়, বরং সারা বিশ্বের নারী সাংবাদিকদের জন্য এক রূঢ় সত্য।

অনলাইন হয়রানি ও নারী সাংবাদিকদের ওপর আঘাত

ব্রাসেলসের সেই আলোচনায় আনা ব্রাকাস অত্যন্ত সততার সাথে তুলে ধরেন যে, কীভাবে তিনি এবং তার নারী সহকর্মীরা প্রতিনিয়ত অনলাইন লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন। তিনি বলেন;’আমি এবং আমার নারী সহকর্মীরা নিয়মিতভাবে যে পরিমাণ অনলাইন হয়রানির শিকার হই, তা বলে শেষ করা সম্ভব নয়। ২০২৩ সালে আমাদের প্রতিষ্ঠান ‘ফ্যাক্টোগ্রাফ’ ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফ্যাক্ট-চেকারদের ওপর হওয়া হয়রানি নিয়ে একটি গবেষণা চালায়। সেখানে আমরা দেখেছি যে, ফ্যাক্ট-চেকিং নিউজরুমগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ বেশি হওয়ায় তাদেরকেই সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু করা হয়। আমাদের কাজের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করতে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে লিঙ্গবাদী এবং নারীবিদ্বেষী আক্রমণ চালানো হয়। এটি কেবল ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং এটি আমাদের পেশাদারিত্বের মূলে আঘাত করার এক নোংরা কৌশল।’

আইনি অসহায়ত্ব ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব

আনা ব্রাকাস তার বক্তব্যে সেই গভীর সংকটের কথা তুলে ধরেন যেখানে রাষ্ট্র বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়। তিনি আমাদের সমাজ ও শাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে বলেন; ‘আমরা যখন এসব হয়রানি বা হুমকির বিষয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাই, তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের কথা কেউ শুনতে চায় না। অনলাইন থেকে শুরু করে শারীরিক লাঞ্ছনার মতো ভয়ঙ্কর হুমকিগুলোকেও সাধারণত গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ক্রোয়েশিয়া সরকার কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যায়ে যে সকল নীতিমালা বা প্রোটোকল তৈরি করা হয়েছে, সেগুলো আসলে বাস্তবে তেমন কোনো কাজে আসছে না। কারণ এসব আইন কার্যকর করার জন্য যে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন, তার বড় অভাব রয়েছে। অন্যদিকে, আমাদের বর্তমান মিডিয়া ব্যবস্থা এখন ব্যবসায়িক মুনাফায় এতটাই বুঁদ হয়ে আছে যে, নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা বা জনস্বার্থ রক্ষা নিয়ে আলোচনার কোনো জায়গাই সেখানে অবশিষ্ট নেই।’

মানসিক চাপ ও সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ

দীর্ঘদিন ধরে অপতথ্য এবং সমন্বিত অনলাইন প্রচারণার বিরুদ্ধে লড়াই করা যে কতটা ক্লান্তিকর, তা আনার কণ্ঠে ফুটে উঠেছে। তিনি মনে করেন, এই লড়াই যেমন অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তেমনি মানসিকভাবেও একজন সাংবাদিককে নিঃস্ব করে দেয়। তিনি আরও বলেন;’সমন্বিত অনলাইন হয়রানি প্রচারণা আমাদের জীবনীশক্তি শুষে নিচ্ছে। মানসিকভাবে এবং আর্থিকভাবে এটি আমাদের নিঃশেষ করে দিচ্ছে। যে শ্রম ও সম্পদ আমরা জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যয় করতে চাইতাম, তা এখন ব্যয় হচ্ছে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। বিশ্বজুড়ে পপুলিস্ট বা জনতুষ্টিবাদী দলগুলো যেভাবে ফ্যাক্ট-চেকারদের লক্ষ্যবস্তু করছে, তাতে আমাদের মতো মানুষদের সহায়তা করার জন্য আরও অনেক কিছু করা প্রয়োজন। আক্রমণকারীদের দায়মুক্তির যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা বন্ধ করতে হবে।’

একটি নিরাপদ কর্মক্ষেত্রের আহ্বান

আনা ব্রাকাস কেবল সমস্যার কথা বলে থেমে যাননি, বরং সমাধানের পথও বাতলে দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, কেবল মুখের কথায় কাজ হবে না, বরং বাস্তব বিনিয়োগ প্রয়োজন। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন ‘আমাদের সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করতে হবে। যারা নিয়মিত আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, তাদের জন্য পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার ব্যবস্থা রাখা জরুরি। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, এই ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকারকে এবং সংস্থাগুলোকে আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। কেবল তখনই আমরা এবং আমাদের মতো সাংবাদিকরা তাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম হবো। সত্য রক্ষার এই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য মানসিক সুস্থতা ও নিরাপত্তা আমাদের মৌলিক অধিকার।’

আনা ব্রাকাসের জীবন ও তার বক্তব্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, তথ্যের শুদ্ধতা বজায় রাখার এই লড়াইটি কেবল কম্পিউটারের স্ক্রিনে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। আনা ব্রাকাসের মতো সাহসী মানুষরা আছেন বলেই আজও সাধারণ মানুষ মিথ্যার ভিড়ে সত্যকে খুঁজে পাওয়ার আশা হারায়নি। তার জীবনের লক্ষ্য একটাই-তথ্য হবে স্বচ্ছ, আর সাংবাদিকরা হবেন সুরক্ষিত। কারণ কলমের চেয়েও শক্তিশালী হলো সেই সত্য, যা আনা ব্রাকাসের মতো যোদ্ধারা বুক দিয়ে আগলে রাখছেন।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর