Thursday 23 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

গি‌জেল মার্টিনস: ব্রাজিলের কণ্ঠস্বর ও সাংবাদিকতার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের আইকন

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৯:২৭

সরু গলি, গাদাগাদি ঘর আর প্রতিকূলতার পাহাড়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকা এক জনপদ ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর রিয়েল ফাবেলা। এই ঘিঞ্জি বস্তির অলিগলিতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এক নারী সাংবাদিক গি‌জেল মার্টিনস (Gizele Martins)। আজ বিশ্বজুড়ে এক পরিচিত নাম। কোনো মূলধারার সংবাদপত্রের এসি রুমে বসে তিনি খবরের জোগান দেন না; বরং নিজেই হয়ে ওঠেন সেই প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর, যারা মূলধারার মিডিয়ার কাছে প্রায় অদৃশ্য।একজন কমিউনিটি সাংবাদিক হিসেবে গি‌জেল মার্টিনসের যাত্রা কেবল পেশা নয়, বরং এক ধরনের প্রতিবাদ। কীভাবে তিনি বস্তির অন্ধকার থেকে আলোর পথে খবর নিয়ে এলেন, তার গল্পটি অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক।

বিজ্ঞাপন

গি‌জেল মার্টিনসের কাছে সাংবাদিকতার সংজ্ঞা যেমন

গি‌জেলের কাজের ধরণ প্রথাগত সাংবাদিকতার চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। তিনি মনে করেন, সাংবাদিকতা মানে শুধু ঘটনা রিপোর্ট করা নয়, বরং সেই ঘটনার সাথে জড়িত মানুষের জীবনকে ধারণ করা। যখন বড় বড় গণমাধ্যম ফাবেলার ছবি আঁকে কেবল অপরাধ, মাদক বা সহিংসতার চশমা দিয়ে, গি‌জেল তখন সেই একই ফাবেলার গল্প শোনান শিক্ষা, সংস্কৃতি, অধিকার এবং বাঁচার আকুতির মাধ্যমে।তিনি তার এলাকায় কাজ করার জন্য বেছে নিয়েছেন ‘কমিউনিটি মিডিয়া’। স্থানীয় তরুণদের নিয়ে তিনি তৈরি করেছেন একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, যারা নিজেরাই তাদের এলাকার সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলো তুলে ধরে।

গিজেল মার্টিনস যেভাবে কাজ করেন

গি‌জেল মার্টিনস যে উপায়ে সাংবাদিকতা করেন, তা বর্তমানে ‘কমিউনিটি জার্নালিজম’ বা ‘ফাবেলা জার্নালিজম’-এর একটি মডেল হিসেবে স্বীকৃত। কারন গিজেল মার্টিনস নিজেই একজন বস্তির মানুষ। আর তাই মানুষ তাকে বিশ্বাস করে, নির্ভয়ে মনের কথা খুলে বলে। গি‌জেল নিজেই তার মোবাইলের ক্যামেরা ও সোশ্যাল মিডিয়াকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কোনো এলাকায় পুলিশি অভিযান বা সরকারি অবহেলার খবর মুহূর্তেই তিনি ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে সরাসরি ছড়িয়ে দেন। এতে মূলধারার মিডিয়া চাইলেও আর ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে পারে না। তিনি কেবল আবেগ দিয়ে লেখেন না, বরং তথ্যের দিকেও তার তীক্ষ্ণ নজর থাকে। স্থানীয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর সাথে কাজ করার সময় তিনি সরকারি নথিপত্র, নীতিমালার সাথে ফাবেলার বাস্তবের তুলনা করেন।

যে চ্যালেঞ্জ তিনি জয় করেছেন

ফাবেলার সাংবাদিকতা মোটেও সহজ কাজ নয়। একদিকে আছে সরকারি অবহেলা, অন্যদিকে আছে স্থানীয় অপরাধী চক্রের রক্তচক্ষু। গি‌জেলকে বহুবার হুমকি ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি দমে যাননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, যদি তিনি চুপ করে থাকেন, তবে ফাবেলার হাজারো মানুষের কণ্ঠস্বর চিরতরে হারিয়ে যাবে। তিনি সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছেন। কীভাবে সাধারণ মানুষ তাদের নিজেদের অধিকারের জন্য লড়তে পারে, তা তিনি হাতে-কলমে দেখিয়েছেন।

সাংবাদিক হিসেবে উত্তরণ

গি‌জেল মার্টিনস আজ শুধু একজন সাংবাদিক নন, তিনি একজন গবেষক ও মানবাধিকার কর্মীও। তিনি সাংবাদিকতার সেই পুরনো জরাজীর্ণ দেওয়াল ভেঙে দিয়েছেন, যেখানে সাংবাদিককে হতে হয় কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের অংশ। তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন সাংবাদিকের আসল শক্তি প্রতিষ্ঠানের লোগোতে নয়, বরং তার সততা এবং জনগণের সাথে তার আত্মিক সংযোগে।তার কাজগুলো আজ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং একাডেমিক গবেষণায় নিয়মিত উদ্ধৃত হয়। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, প্রান্তিক জনপদ থেকেও বিশ্বমানের সাংবাদিকতা করা সম্ভব, যেখানে খবরের কেন্দ্রবিন্দু হয় সাধারণ মানুষের জীবনের লড়াই।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফাবেলার বাস্তবচিত্র ও সাংবাদিকতার সুরক্ষা

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে ২০২৫ সালে ব্রাসেলস-এ আর্টিকেল নাইনন্টিন একটি আলোচনার আয়োজন করে। গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা, অ্যাসোসিয়েশন অফ ইউরোপীয় জার্নালিস্ট বেলজিয়াম এবং মিডিয়া ফ্রিডম র‍্যাপিড রেসপন্সের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই আলোচনায় উঠে আসে নারী সাংবাদিকদের ওপর ক্রমবর্ধমান হুমকির চিত্র। এই অনুষ্ঠানের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল কীভাবে নারী সাংবাদিকরা তাদের কাজের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত সহিংসতার মুখোমুখি হন এবং কীভাবে এসবের সমাধান খুঁজতে হবে। বাংলাদেশ, ব্রাজিল এবং ক্রোয়েশিয়ার সাংবাদিকরা সেখানে তাদের নিজ নিজ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। গি‌জেল মার্টিনস সেখানে ফাবেলার জীবন ও সাংবাদিকতার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা এমনভাবে উপস্থাপন করেন যা উপস্থিত সকলের চিন্তার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভ ও দৃঢ়তার সাথে বলেন যে, আমরা একটি গণতান্ত্রিক দেশে বাস করার দাবি করি ঠিকই, কিন্তু মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে প্রকৃত গণতন্ত্রের ছিটেফোঁটাও সেখানে নেই। নারী সাংবাদিক এবং কমিউনিটি সাংবাদিকদের কাজের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ বা নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা আজও তৈরি হয়নি।

রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও নারী সাংবাদিকদের দ্বিমুখী লড়াই

আলোচনায় গি‌জেল তার এলাকার ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে বলেন, ফাবেলার বাসিন্দারা মাদক ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পুলিশ বাহিনী। সব পক্ষের কাছ থেকেই ক্রমাগত সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। পুলিশের নিয়মিত তল্লাশি ও আক্রমণের শিকার হতে হয় বস্তির সাধারণ মানুষকে। তবে নারী সাংবাদিক হিসেবে এই পরিস্থিতি তার জন্য আরো বেশি জটিল। গি‌জেল জানান, ফাবেলায় কর্মরত নারী সাংবাদিকদের ওপর চলা আক্রমণগুলো কেবল পেশাগত বাধা নয়, এগুলোর একটি সুস্পষ্ট লিঙ্গভিত্তিক রূপ রয়েছে। যৌন হয়রানি এবং নানা ধরনের ভীতি প্রদর্শনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় তাদের মুখ বন্ধ করার জন্য। গি‌জেল নিজে একজন সামাজিক যোগাযোগকারী ও অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হলেও রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। ভুক্তভোগী সাংবাদিক বা তৃণমূলের মানুষদের সুরক্ষায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপই রাষ্ট্র গ্রহণ করেনি।

অন্তর্ভুক্তি ও প্রতিরোধের নতুন কৌশল

গি‌জেল তার বক্তব্যে খুব স্পষ্ট করে বলেন যে, নারী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা নিয়ে আলোচনা করার সময় আমাদের অবশ্যই কৃষ্ণাঙ্গ, লেসবিয়ান এবং ট্রান্সজেন্ডার সাংবাদিকদের বাস্তবতার দিকে নজর দিতে হবে। তাদের অন্তর্ভুক্ত না করে যদি কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়, তবে তা উল্টো তাদের ওপর হওয়া প্রতিদিনের নির্যাতনকেই আরও তীব্র করে তুলতে পারে। এই সমস্যার কোনো ‘এক মাপ সবার জন্য’ বা গৎবাঁধা সমাধান সম্ভব নয়। তবে এত অন্ধকার ও হুমকির মধ্যেও গি‌জেল আশার আলো দেখেন কমিউনিটির ঐক্যের মাঝে। তিনি জানান, পুলিশের সহিংসতা যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন ফাবেলার মানুষ একে অপরের পাশে এসে দাঁড়ায়। সিগন্যাল বা হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তারা এক ধরনের সুরক্ষা কৌশল গড়ে তুলেছে। আইনজীবীরা আটকে পড়া মানুষদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো রাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য সোচ্চার হয়। গি‌জেলের মতে, এই সম্মিলিত প্রতিরোধ কেবল সাংবাদিক বা অ্যাক্টিভিস্টদের জন্যই নয়, বরং তাদের পরিবারগুলোর জন্যও অত্যন্ত জরুরি যারা সবসময় এই লড়াইয়ের চরম মূল্য দিয়ে আসছেন। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাই প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র বা অন্য কোনো পক্ষ চাইলেই সত্যের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করতে পারে না, যদি কমিউনিটি নিজেরাই নিজেদের রক্ষাকবচ হয়ে ওঠে।

গিজেল মার্টিনস থেকে শেখা

গি‌জেল মার্টিনসের এই নিরন্তর লড়াই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাংবাদিকতা আসলে একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা। যখন মূলধারার মিডিয়া প্রান্তিক মানুষের গল্পকে উপেক্ষা করে, তখন গি‌জেল মার্টিনসের মতো মানুষেরা উঠে আসেন অন্ধকার থেকে। ফাবেলার সরু গলি থেকে উঠে আসা এই সাহসী নারী সাংবাদিকতা এবং সামাজিক পরিবর্তনের সেতুবন্ধনে আজ এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

গি‌জেল মার্টিনস আমাদের শেখান, খবর কেবল কাগজে ছাপা হওয়ার জন্য নয়, খবর হয় পরিবর্তনের হাতিয়ার হওয়ার জন্য।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর