বিহারের পাটনায় জন্ম নেওয়া চঞ্চল ছেলেটি যে একদিন পুরো ভারতের বিনোদন জগতের চেনা ছক বদলে দেবে, তা হয়তো কেউ ভাবেনি। ভাবনার দড়জা পুরোপুরি না খুলতেই তার জীবন প্রদিপ নিভে গেলো মাত্র ৩৪ বছর বয়সে। বলছি, বলছি বলিউডের সেই অদম্য ও প্রতিভাবান অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের কথা। যিনি কেবল পর্দায় অভিনয়ের জাদু দেখাননি, বরং প্রথাগত স্টারডমের বাইরে গিয়ে নিজের একটি সম্পূর্ণ আলাদা জগৎ তৈরি করেছিলেন। আজ ১৪ জুন, প্রয়াণ দিবস।
২০০৩ সালে অল ইন্ডিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ট্রান্স এক্সামিনেশনে (AIEEE) সপ্তম স্থান অধিকার করে দিল্লির একটি নামী কলেজে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু যার রক্তে মিশে ছিল শিল্প আর সৃজনশীলতা, তাকে কি আর চার দেয়ালের থিওরি আটকে রাখতে পারে? ফলে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে থিয়েটার এবং শামাক দাভারের নাচের দলে যোগ দিয়ে শুরু হয় তার আসল লড়াই।
মিডিয়া জগতে সুশান্তের প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল ২০০৮ সালে ‘কিস দেশ মে হ্যায় মেরা দিল’ ধারাবাহিকের মাধ্যমে। তবে ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে চলা ‘পবিত্র রিশতা’ নাটকের ‘মানব দেশমুখ’ চরিত্রটি তাকে ভারতের ঘরে ঘরে এক তুমুল জনপ্রিয় মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠা এনে দেয়। ছোট পর্দার সেই বিপুল সাফল্যকে পুঁজি করে ২০১৩ সালে ‘কাই পো চে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় পা রাখেন সুশান্ত। প্রথম সিনেমাতেই বাজিমাত করার পর ২০১৪ সালে আমির খানের ব্লকবাস্টার ‘পিকে’ সিনেমায় ‘সারফরাজ’ চরিত্রে ছোট কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি চরিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজের জাত চেনান। এরপর ২০১৫ সালে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী চরিত্র অবলম্বনে ‘ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী’ সিনেমায় একেবারে ভিন্ন রূপ নিয়ে হাজির হন সুশান্ত, যা তার অভিনয় জীবনের অন্যতম সেরা নিরীক্ষা হিসেবে গণ্য করা হয়।
তবে ২০১৬ সালটি ছিল সুশান্তের ক্যারিয়ারের স্বর্ণালী অধ্যায়। ‘এম এস ধোনি: দ্য আনটোল্ড স্টোরি’ সিনেমায় ভারতের সফলতম ক্রিকেট অধিনায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে তিনি যেন নিজেকেই ছাড়িয়ে যান। ধোনির হেলিকপ্টার শট হুবহু নকল করতে গিয়ে মাসের পর মাস নেটে যে হাড়ভাঙা খাটুনি তিনি খেটেছিলেন, তার ফল মিলেছিল বক্স অফিসের সাফল্যের মধ্য দিয়ে। এরপর ২০১৮ সালে কেদারনাথের ভয়াবহ বন্যার পটভূমিতে তৈরি ‘কেদারনাথ’ এবং ২০১৯ সালে ‘ছিছোরে’ সিনেমার মতো দারুণ সব কাজ উপহার দেন তিনি। বিশেষ করে ‘ছিছোরে’ সিনেমায় তরুণ প্রজন্মকে জীবনের ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠে লড়াই করার যে অনুপ্রেরণা তিনি দিয়েছিলেন, তা আজও সিনেমা প্রেমীদের মনে গেঁথে আছে।
ধোনি স্টাইলে ছক্কা মেরে পর্দার ওপাড়ে কোটি কোটি মানুষকে উল্লাসে ভাসানো সেই চেনা হাসিমুখের তরুণটি যে এভাবে বাস্তব জীবনের পিচ থেকে অকালে বিদায় নেবেন, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। ২০২০ সালের ১৪ জুনের সেই বিষাদগ্রস্ত দুপুরটি এক নিমিষেই স্তব্ধ করে দিয়েছিল পুরো বলিউডসহ বিশ্বজুড়ে থাকা তার কোটি ভক্তকে। রুপালি পর্দার গ্ল্যামার আর আলোর ঝলকানিকে পেছনে ফেলে মহাকাশ আর পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সমীকরণে বুঁদ হয়ে থাকা সুশান্ত সিং রাজপুত নামের সেই প্রতিভাবান অভিনেতা আজ আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া কীর্তি আজও দর্শক হৃদয়ে অম্লান।
সুশান্ত কেবল একজন সাধারণ অভিনেতা ছিলেন না, তার চোখজুড়ে ছিল মহাকাশ বিজ্ঞানের প্রতি অদম্য এক ভালোবাসা। বলিউডের একমাত্র তারকা হিসেবে তিনি চাঁদে জমি কিনেছিলেন এবং মহাশূন্যের নক্ষত্রপুঞ্জ দেখার জন্য কিনেছিলেন অত্যন্ত দামি ও শক্তিশালী একটি টেলিস্কোপ। অবসরে শুটিং সেটের বাইরে চাঁদের আলো আর মহাবিশ্বের রহস্য নিয়ে পড়াশোনা করতেই তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।
২০২০ সালে মুক্তি পাওয়া তার শেষ চলচ্চিত্র ‘দিল বেচারা’ দেখার সময় ভক্তরা চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। আজকের এই বিশেষ দিনে সুশান্তের সেই বর্ণিল মিডিয়া ক্যারিয়ার আর জীবনের গল্প গুগলের ট্রেন্ড ও সারাবাংলার পাতায় আরও একবার মনে করিয়ে দেয়,কিছু মানুষ চলে গেলেও তাদের রেখে যাওয়া কাজ দিয়ে তারা বেঁচে থাকেন অনন্তকাল।
আজ তার এই প্রয়াণ দিবসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাতাগুলো আবারও সিক্ত হচ্ছে ভক্তদের ভালোবাসায় ও স্মৃতিকাতরতায়। অগণিত ভক্তদের কাছে সুশান্তের এই চলে যাওয়া আজও বিনোদন জগতের সবচেয়ে বড় এবং রহস্যময় এক শূন্যতা। প্রতি বছর ১৪ জুন এলে ভক্তরা সিনেমার এই ধোনিকে মনে করেন, যিনি জীবনের শেষ ট্র্যাজিক ডাইভে কোটি ভক্তের চোখে জল এনে নিজে এক অনন্ত নক্ষত্রবীথির বাসিন্দা হয়ে গেছেন।