একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি…
একজন পাঠক যখন কোনো সংবাদ প্রতিবেদন পড়ে উঠে দাঁড়ান, তখন তার মাথায় কী থাকা উচিত? ঘটনাটা আসলে কী ঘটেছিল, সেই তথ্য? নাকি একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য, একটি নির্দিষ্ট সন্দেহ, একটি পূর্বনির্ধারিত উত্তর?
আজ (১৪ জুন, ২০২৬) দৈনিক আমার দেশে প্রকাশিত ‘দুই দেশের বিবৃতিতে রহস্যময় ফারাক’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি পড়ার পর এই প্রশ্নটাই বারবার সামনে আসে। কারণ প্রতিবেদনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ধরেছে। দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন, সীমান্তে পুশইন, সীমান্ত হত্যা, যৌথ বিবৃতির ভাষা এবং বিজিবির পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির পার্থক্য — এসবই জনস্বার্থের বিষয়। এগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা সাংবাদিকতার ন্যায্য কাজ। কিন্তু প্রশ্ন তোলা আর উত্তর বানিয়ে দেওয়া এক জিনিস নয়। এখানেই প্রতিবেদনটি পেশাগতভাবে হোঁচট খেয়েছে।
বিল কোভাচ ও টম রোজেনস্টিল তাঁদের The Elements of Journalism গ্রন্থে সাংবাদিকতার প্রথম নীতি হিসেবে লিখেছেন: ‘Journalism’s first obligation is to the truth.’ এই বাক্যটি সাংবাদিকতার নৈতিক মেরুদণ্ড। কিন্তু সত্য মানে কেবল তথ্যের উপস্থিতি নয়। সত্য মানে তথ্যের সঙ্গে প্রেক্ষাপট, যাচাই, ন্যায্যতা — এবং পাঠককে বিভ্রান্ত না করার পেশাগত সততা। আমার দেশের আলোচিত প্রতিবেদনটি তথ্য অনুসরণ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। বরং একটি সন্দেহ আগেই স্থির করা হয়েছে, তারপর তথ্যগুলোকে সেই সন্দেহের পক্ষে সাজানো হয়েছে।
প্রতিবেদনটির প্রধান যুক্তিগুলো হলো — যৌথ বিবৃতিতে ‘পুশইন’ এর পরিবর্তে Forcible Illegal Crossing আছে; ‘সীমান্ত হত্যা’-র বদলে ‘সীমান্তে সংঘটিত মৃত্যু’ আছে; আর বিজিবির পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থের কথা বিস্তারিত এসেছে। এই পার্থক্যগুলো নিয়ে প্রশ্নও তোলা যায়। কিন্তু যৌথ বিবৃতিতে কোনো শব্দ না থাকা একটি তথ্য; কেন নেই, সেটি অনুসন্ধানের বিষয়। এই অনুপস্থিতি থেকে সরাসরি ‘আত্মসমর্পণ’, ‘আপোস’, ‘দ্বিমুখী নীতি’ বা ‘ভারতের প্রতি দুর্বলতা’-র মতো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো তথ্যের বিশ্লেষণ নয়, সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল।
কোভাচ ও রোজেনস্টিল সাংবাদিকতার তৃতীয় মৌলিক নীতি হিসেবে বলেছেন: ‘Its essence is a discipline of verification।’ একটি শব্দ ব্যবহারের আগে প্রতিবেদককে নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হয় — এই শব্দটি কি প্রমাণিত? নাকি আমি চাইছি পাঠক এভাবেই ভাবুক? ‘আত্মসমর্পণ’ কোনো সাধারণ শব্দ নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ। এই অভিযোগ সংবাদ প্রতিবেদনে ব্যবহার করতে হলে নথি, অন-রেকর্ড সাক্ষ্য এবং বহুপক্ষীয় যাচাই দরকার। প্রতিবেদনে তার বদলে আছে অজ্ঞাতনামা সূত্র, অনুমাননির্ভর ব্যাখ্যা আর নাটকীয় শব্দচয়ন।
ভাষার প্রশ্নটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। জোসেফ পুলিৎজার তার সম্পাদকীয় দর্শনে বলেছিলেন, একটি সংবাদপত্রের সংবাদে, শিরোনামে ও সম্পাদকীয়তে যা দরকার তা হলো — ‘terseness, humor, descriptive power, satire, originality, good literary style, clever condensation and accuracy, accuracy, accuracy।’ সাংবাদিকতার শক্তি নাটকীয়তায় নয়, যথার্থতায়। কিন্তু আমার দেশের প্রতিবেদনে ‘রহস্যময় ফারাক’, ‘আপোসকামী অবস্থান’, ‘দ্বিমুখী নীতি’, ‘ভারতের প্রতি দুর্বলতা’ — এসব শব্দ সংবাদ প্রতিবেদনের সংযত ভাষা নয়, এগুলো সম্পাদকীয়র ভাষা। সংবাদ প্রতিবেদনে এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করতে হলে দৃশ্যমান প্রমাণ থাকতে হয়।
অজ্ঞাতনামা সূত্র সাংবাদিকতায় নিষিদ্ধ নয়। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বা কূটনৈতিক বিষয়ে কখনো কখনো নাম প্রকাশ না করা সূত্র প্রয়োজন হয়। কিন্তু অজ্ঞাতনামা সূত্রেরও নৈতিক সীমা আছে। সূত্র তথ্য দিতে পারে, ঘটনার ভেতরের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে পারে — কিন্তু অজ্ঞাতনামা সূত্রের মুখে কারও আনুগত্য বা চরিত্র নিয়ে অভিযোগ বসিয়ে দেওয়া সাংবাদিকতার স্বচ্ছতার সঙ্গে যায় না। ‘বিজিবি আত্মসমর্পণ করেছে’ বা ‘ভারতের প্রতি দুর্বলতা রয়েছে’ — এসব বক্তব্য যাচাইকৃত তথ্য নয়, মূল্যবিচার। এই মূল্যবিচার অজ্ঞাতনামা সূত্রের আড়ালে পরিবেশন করা হলে পাঠক বুঝতে পারেন না — এটি প্রমাণিত তথ্য, নাকি প্রতিবেদনের নিজস্ব ন্যারেটিভ।
কূটনৈতিক দলিলের প্রকৃতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যৌথ প্রেস বিবৃতি, জয়েন্ট রেকর্ড অফ ডিসকাশন (জেআরডি) এবং বিজিবির নিজস্ব সংবাদ বিজ্ঞপ্তি একই ধরনের দলিল নয়। যৌথ বিবৃতি সাধারণত দুপক্ষের ন্যূনতম সম্মতির ভাষায় তৈরি হয়; সেখানে এমন ভাষাই থাকে যা উভয় পক্ষ প্রকাশ্যে গ্রহণ করতে পারে। এই তিন দলিলের ভাষা আলাদা হওয়াই কূটনৈতিক বাস্তবতায় স্বাভাবিক। বিজিবির জবাবে বলা হয়েছে, জেআরডিতে ‘কিলিং’ ও ‘পুশ ইন’ শব্দটি আছে। তাহলে যৌথ প্রেস বিবৃতির শব্দচয়নকে একমাত্র ভিত্তি ধরে বলা যায় না যে বিজিবি সীমান্ত হত্যার প্রশ্নে অবস্থান বদলে ফেলেছে।
ওয়াল্টার লিপম্যান Public Opinion গ্রন্থে যে সতর্কতা উচ্চারণ করেছিলেন সেটি এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক: ‘The news and truth are not the same thing।’ সংবাদ ঘটনার সংকেত দেয়, কিন্তু সত্য উদ্ঘাটনের জন্য দরকার লুকানো তথ্যকে আলোয় আনা এবং পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত করা। আমার দেশের প্রতিবেদনটি ঘটনার সংকেত দিয়েছে, কিন্তু সত্য উদ্ঘাটনের শ্রম করেনি। এখানে ঘটনা আছে, কিন্তু প্রেক্ষাপট নেই। প্রশ্ন আছে, কিন্তু যাচাইয়ের শৃঙ্খলা নেই। সন্দেহ আছে, কিন্তু সন্দেহকে সন্দেহ হিসেবে রাখা হয়নি — তাকে প্রায় প্রমাণিত সত্যের মতো পরিবেশন করা হয়েছে।
নোয়াম চমস্কি ও এডওয়ার্ড হারম্যান Manufacturing Consent গ্রন্থে লিখেছেন: ‘The mass media serve as a system for communicating messages and symbols to the general populace. It is their function to amuse, entertain, and inform, and to inculcate individuals with the values, beliefs, and codes of behavior that will integrate them into the institutional structures of the larger society।’ এই বাক্যের মর্ম হলো, সংবাদমাধ্যম শুধু তথ্য বহন করে না — ভাষা, ফ্রেম ও অগ্রাধিকারের মাধ্যমে ধারণাও নির্মাণ করে। কোন তথ্য সামনে আসবে, কোন শব্দে ঘটনা ফ্রেম হবে, কোন জবাবকে গুরুত্ব দেওয়া হবে আর কোনটিকে সন্দেহের ভেতর আটকে রাখা হবে — এই পছন্দগুলোই একটি ন্যারেটিভ তৈরি করে।
আমার দেশের প্রতিবেদনটি ঠিক এই কৌশলে এগিয়েছে। প্রথমে শিরোনামে ‘রহস্য’ তৈরি করা হয়েছে। এরপর দুটো দলিলের পার্থক্য দেখিয়ে সন্দেহের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তারপর অজ্ঞাতনামা সূত্রের মুখে ‘আত্মসমর্পণ’ ও ‘আপোস’ বসানো হয়েছে। বিজিবির জবাব রাখা হয়েছে, কিন্তু সেটিকে সন্দেহকাঠামো ভাঙার মতো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। শেষে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকে ‘গোপন’ ফ্রেমে ফিরিয়ে এনে সন্দেহটিকে আবার শক্তিশালী করা হয়েছে। পাঠককে খোলা অনুসন্ধানের পথে নেওয়া হয়নি; তাঁকে একটি পূর্বনির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় আলাদা করে বলা দরকার। সীমান্তে পুশইন, সীমান্ত হত্যা, অবৈধ অবকাঠামো — এসব বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুতর ইস্যু। বিজিবির অবস্থান, সরকারের কূটনৈতিক পদক্ষেপ, বিএসএফের ভাষা, ভারতের অবস্থান — সবকিছুই যাচাই হওয়া দরকার। কিন্তু দুর্বল রিপোর্টিং আসল প্রশ্নকে শক্তিশালী করে না — বরং প্রশ্নটিকেই অবিশ্বাস্য করে তোলে।
হাচিন্স কমিশন ১৯৪৭ সালে দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমের কাজ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিল, প্রেসকে দিতে হবে ‘a truthful, comprehensive, and intelligent account of the day’s events in a context which gives them meaning।’ এই মানদণ্ডে আমার দেশের প্রতিবেদনটি ব্যর্থ। কারণ এখানে ঘটনা আছে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট নেই; প্রশ্ন আছে, কিন্তু যাচাইয়ের শৃঙ্খলা নেই; বিজিবির জবাব আছে, কিন্তু সেটিকে ন্যায্যভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি।
সাংবাদিকতার নীতি বলে — সন্দেহ থাকলে প্রশ্ন তুলুন, কিন্তু সন্দেহকে সত্য হিসেবে বিক্রি করবেন না। সূত্র থাকলে তথ্য দিন, কিন্তু সূত্রের মতামতকে প্রমাণ বানাবেন না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনুন, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া ব্যক্তির আনুগত্য নিয়ে ইঙ্গিত করবেন না। আর সংবাদ লিখুন — সম্পাদকীয় ভাষাকে সংবাদের ছদ্মবেশে হাজির করবেন না। এই মানদণ্ডে ‘দুই দেশের বিবৃতিতে রহস্যময় ফারাক’ প্রতিবেদনটি সাংবাদিকতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে না। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থমূলক বিষয়ের ওপর দাঁড়ালেও তার নির্মাণ দুর্বল, ভাষা পক্ষপাতদুষ্ট, সূত্র অস্পষ্ট এবং উপসংহার অতিরঞ্জিত। ফলে এটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার চেয়ে বেশি মনে হয় উদ্দেশ্যমূলক ন্যারেটিভ ফিক্সিংয়ের একটি দৃষ্টান্ত।
বাংলাদেশের সীমান্ত বাস্তবতা জটিল। সেখানে আবেগ আছে, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ আছে, মানবাধিকার আছে, নিরাপত্তা আছে। এই জটিলতাকে বোঝার জন্য দরকার ধৈর্যশীল, প্রমাণভিত্তিক, সংযত ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা। মনগড়া সন্দেহ, অর্ধসত্য আর নাটকীয় শব্দের ওপর দাঁড়ানো প্রতিবেদন সেই কাজ করে না। বরং জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করে এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার আলোচনাকে প্রয়োজনীয় গাম্ভীর্য থেকে সরিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনার দিকে ঠেলে দেয়।
সংবাদপত্রের পৃষ্ঠায় ছাপা হলেই সব লেখা সাংবাদিকতা হয় না।