হলিউডের ইতিহাসে এমন কিছু অভিনেতা আছেন যারা ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে নিজের আসল চেহারাটা পুরোপুরি ভুলে যান, আর মিশে যান চরিত্রের গভীরে। এই তালিকার একদম প্রথম সারিতে যার নাম আসে, তিনি আর কেউ নন,আমাদের সবার প্রিয় জনি ডেপ। ১৯৬৩ সালের ৯ জুন আমেরিকার কেনটাকিতে জন্ম নেওয়া এই অভিনেতা আজ পা রাখলেন জীবনের এক নতুন বসন্তে। জনি ডেপ মানেই চোখের চারপাশে গাঢ় কাজল, অদ্ভুত সব পোশাক, আর পর্দায় এমন এক খামখেয়ালী চরিত্র যা দর্শকদের এক নিমেষে বাস্তব পৃথিবী থেকে দূরে কোথাও নিয়ে যায়। জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পার করলেও জনি ডেপ তার অভিনয় দক্ষতা দিয়ে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে এমন এক আসন তৈরি করেছেন, যা ভাঙা অসম্ভব। আজ ৯ জুন, এই কিংবদন্তি অভিনেতার জন্মদিনে তার বর্ণিল অভিনয় জীবনের কিছু চমৎকার ও সত্য গল্পে চোখ বোলানো যাক।
জনি ডেপের ক্যারিয়ারের কথা বললে যে চরিত্রটির ছবি সবার আগে চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তা হলো ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান’ ফ্র্যাঞ্চাইজির সেই অদ্ভুতুড়ে জলদস্যু ক্যাপ্টেন জ্যাক স্প্যারো। ২০০৩ সালে যখন এই চরিত্রটির জন্ম হয়, তখন ডিজনির বড় বড় কর্তারা জনি ডেপের অভিনয় দেখে বেশ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন। জনি ডেপ চরিত্রটিকে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন যেন সে সবসময় কিছুটা মাতাল, তার হাঁটার ঢং ছিল অদ্ভুত আর কথা বলার ধরন ছিল জট পাকানো। ডিজনির তৎকালীন প্রধানরা জনিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে চরিত্রটি কি সমকামী নাকি সারাক্ষণ নেশাগ্রস্ত থাকে? জনি ডেপ তখন মুচকি হেসে উত্তর দিয়েছিলেন যে তার সব চরিত্রই আসলে একটু ভিন্ন ধাঁচের হয়। শেষ পর্যন্ত জনির সেই খামখেয়ালী রূপের ওপর ভর করেই ছবিটি ব্লকবাস্টার হয় এবং জ্যাক স্প্যারো চরিত্রটি পপ কালচারের ইতিহাসে এক অমর সৃষ্টিতে পরিণত হয়, যা তাকে এনে দেয় অস্কারের মনোনয়ন।
জনি ডেপের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তিনি কখনোই সাধারণ চকোলেট বয় বা রোমান্টিক নায়কের চরিত্রে নিজেকে আটকে রাখতে চাননি। পরিচালক টিম বার্টনের সাথে জুটি বেঁধে তিনি হলিউডকে একের পর এক অদ্ভুত কিন্তু ভীষণ আবেগী সব সিনেমা উপহার দিয়েছেন। ১৯৯০ সালের ‘এডওয়ার্ড সিজরহ্যান্ডস’ সিনেমায় তিনি এমন এক কৃত্রিম মানুষের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন যার হাত দুটো ছিল কাঁচি দিয়ে তৈরি, যেখানে পুরো সিনেমায় তিনি মাত্র কয়েকটি সংলাপ বলে শুধু চোখের অভিব্যক্তিতে দর্শকদের কাঁদিয়েছিলেন। আবার ‘চার্লি অ্যান্ড দ্য চকোলেট ফ্যাক্টরি’র উইলি ওয়াংকা কিংবা ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’-এর ম্যাড হ্যাটার চরিত্রে তার মেকআপ এবং রূপবদল এতটাই নিখুঁত ছিল যে চট করে চেনার উপায় ছিল না যে এটিই আমাদের সেই চেনা জনি ডেপ। চরিত্রের জন্য নিজের দাঁত সোনা দিয়ে বাঁধানো থেকে শুরু করে অদ্ভুত সব উইগ পরা, সবকিছুই তিনি করেছেন অত্যন্ত আনন্দের সাথে, যা তাকে হলিউডের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আমরা জনি ডেপকে একজন বিশ্বসেরা অভিনেতা হিসেবে চিনলেও, তার জীবনের আসল স্বপ্ন কিন্তু অভিনেতা হওয়া ছিল না, তিনি হতে চেয়েছিলেন একজন পুরোদস্তুর রক মিউজিশিয়ান। মাত্র বারো বছর বয়সে মায়ের কাছ থেকে একটি গিটার উপহার পেয়ে তিনি সংগীতে মজে যান এবং পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে রক ব্যান্ড দল গঠন করে লস অ্যাঞ্জেলেসে চলে আসেন। সেখানে এসে ভাগ্যক্রমে বিখ্যাত অভিনেতা নিকোলাস কেজের সাথে তার পরিচয় হয় এবং কেজের পরামর্শেই তিনি প্রথম অডিশন দেন ‘আ নাইটমেয়ার অন এলম স্ট্রিট’ সিনেমায়। সেই শুরু, এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি, তবে অভিনয়ে এলেও গিটার এবং মিউজিকের প্রতি তার ভালোবাসা এতটুকু কমেনি। আজ জন্মদিনের এই বিশেষ মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে তার কোটি কোটি ভক্ত কেবল তার দুর্দান্ত সব সিনেমার কথাই স্মরণ করছে না, বরং রূপালি পর্দার এই চিরসবুজ চড়ুই পাখির দীর্ঘায়ু ও সুস্থতা কামনা করছে।