ঢাকা: বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অপ্রতিরোধ্য কণ্ঠস্বর প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন আজ। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরের এক মফস্বল শহরে জন্মগ্রহণ করেন বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের এক অবিসংবাদিত ও প্রভাবশালী চরিত্র খালেদা খানম পুতুল। পরে সেই পুতুলই হয়ে ওঠেন আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সাধারণ এক গৃহবধূ থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই ও সংগ্রামের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি তিনি।
প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন উপলক্ষ্যে সারা দেশে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল করবে বিএনপি। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়। এতে বলা হয়, সারা দেশে দলীয় কার্যালয়ে অথবা মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল হবে। আর ঢাকায় বেলা ১১টায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ কর্মসূচি পালন করা হবে। এ কর্মসূচি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে।
খালেদা জিয়ার বাবা ইস্কান্দার মজুমদারের বাড়ি ফেনীতে হলেও তিনি জলপাইগুড়িতে বোনের বাসায় থেকে পড়ালেখা করেন। সেখানে চা ব্যবসাও করেন তিনি। পরে পরিবার নিয়ে দিনাজপুর শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখানকার একটি মিশনারি স্কুল ও পরে দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন খালেদা জিয়া। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে খালেদার বিয়ে হয়। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য ভূমিকা রাখেন জিয়াউর রহমান। তখন তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ২৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ওই ঘোষণা শুনে বাঙালি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন জিয়াউর রহমান। সে সময় তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সেনা অভু্যত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। এরপর বিএনপির হাল ধরেন তার স্ত্রী খালেদা জিয়া। ১৯৮৩ সালে তার নেতৃত্বে বিএনপি সাতদলীয় জোট গঠন করে এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু করে। সেই আন্দোলনে অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও জোট ছিল। তারা এরশাদ সরকারের সঙ্গে কখনো কখনো সমঝোতায় গেলেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন জোট সমঝোতায় যায়নি। এ কারণেই তিনি আপসহীন নেত্রী অভিধা পান।
১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। পরে তিন আরও দুই দফায় প্রধানমন্ত্রী হন। ওয়ান-ইলেভেনের পর ফখরুদ্দীন-মউনউদ্দিন সরকারের আমলে তিনি কারাবন্দি হন। পরে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়। মিথ্যা মামলায় কারাদণ্ড দেওয়া হয় তাকে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৫ বছরের সরকারের সময়ে বেগম জিয়া কঠোর দমন-পীড়ন ও হয়রানির শিকার হন। এর মধ্যে ছিল সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, কারাবন্দিত্ব ও দীর্ঘদিনের বন্দিজীবন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিপীড়ন হিসেবে বর্ণনা করে।
বিশ্লেষকরা জানান, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই হয়রানির মূল উদ্দেশ্য ছিল বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া। তবে শেষ পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক জনরোষের মুখে পড়ে আওয়ামী লীগ সরকার। গণঅভ্যুত্থানের জেরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার টানা সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরে আসার পথ সুগম হয়।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন দেশনেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তার জানাজায় লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন, যা মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের অন্যতম বড় জানাজায় পরিণত হয়। শোক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে চিরবিদায় জানায় দেশের অগণিত জনগণ। ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নেতৃত্বে এখন আছেন তার জ্যেষ্ঠ ছেলে তারেক রহমান, যিনি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন।