বিশ্বকাপের রঙে বাংলাদেশের টেলিভিশন পর্দা এখন উজ্জ্বল। স্টুডিওতে জার্সি গায়ে সংবাদ পড়া হচ্ছে, উল্লাস আর করতালির শব্দ চারদিকে। ঠিক তখনই দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ে, উপকূলে, সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত জনপদে চলছে আরেক লড়াই। গ্যালারি নেই, ক্যামেরা নেই। আছে পাহাড়ি ঢলের গর্জন, ধসে পড়া মাটি, বুকসমান পানিতে ডুবে থাকা গ্রাম আর প্রাণ বাঁচানোর নিঃশব্দ সংগ্রাম।
গত কয়েক দিনের বন্যা, ভারী বর্ষণ ও ভূমিধসে সাত জেলার ১০ লাখের বেশি মানুষের জীবন বিপর্যস্ত। সরকারি হিসাবে মৃত্যু হয়েছে ৫১ জনের। দুই লাখ ৬৭ হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দী বা বিচ্ছিন্ন। চট্টগ্রাম বিভাগে প্রায় ৮০ হাজার বসতবাড়ি, তিন হাজার ৮৪০ কিলোমিটার সড়ক, ৩৩৯টি সেতু-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত। এই সংখ্যাগুলো পরিসংখ্যান নয়, হাজারো ভাঙা সংসারের নীরব সাক্ষ্য।
জাতীয় মিডিয়ার আলো যেখানে পৌঁছায় না, ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয় বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর অভিযাত্রা। কোনো ক্যামেরা নেই সঙ্গে, প্রচারের বাসনাও নেই। আছে শুধু একটাই অঙ্গীকার — মানুষকে বাঁচাতে হবে।
থানচির দুর্গম থুইসাপাড়ায় বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে আটকা পড়েছিলেন চার পর্যটক। ৪ জুলাই আমিয়াখুমের পথে বেরিয়ে ৭ জুলাই থেকে তারা বন্দী হন প্রকৃতির নিষ্ঠুর জালে। বলিপাড়া ব্যাটালিয়নের ৩৮ বিজিবি কোনো আহ্বানের অপেক্ষা করেনি। ১১ জুলাই শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। প্রথম দিন ভূমিধস ও খরস্রোতার কারণে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়নি, পরদিন আরেকটি দল চার ঘণ্টারও বেশি সময় দুর্গম পাহাড় ও স্রোতস্বিনী ছড়া পেরিয়ে পর্যটকদের নেপিউপাড়া বিওপিতে নিরাপদে নিয়ে আসে। প্রায় ৪৮ ঘণ্টার অভিযান শেষ হয় তাদের নিরাপদে থানচিতে পৌঁছে দেওয়ার মধ্য দিয়ে।
এই দৃশ্য কোনো পেশাদার ক্যামেরায় ধরা পড়েনি। মোবাইল ফোনে তোলা কিছু কম রেজুলেশনের ফুটেজ পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, স্থানীয় মানুষ বা সিটিজেন জার্নালিস্টদের তোলা অপেশাদার সেসব ছবিতেই ধরা আছে পাহাড়ের গা বেয়ে পিছলে পড়া পা, খরস্রোতে একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে রাখার মুহূর্ত। কিন্তু জাতীয় টেলিভিশনের পর্দায় তার প্রত্যাশিত জায়গা হয়নি। উদ্ধার হওয়া চার পর্যটকের কাছে অবশ্য সেই ঘটনাই ছিল জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্ত।
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বান্দরবান, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, ফেনী, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও জামালপুরজুড়ে বিজিবির ৯০টি পর্যবেক্ষণ দল দিনরাত মাঠে রয়েছে। শুধু বান্দরবানেই উদ্ধার করা হয়েছে ১২২টি পরিবারের ছয় শতাধিক মানুষকে, যাঁদের মধ্যে ১১৬ জন পর্যটক। অন্তত ৪৮ জনকে দেওয়া হয়েছে চিকিৎসাসেবা। বন্যার শুরুতেই থানচির নাফাখুম, রেমাক্রি, জিন্নাপাড়া ও বড়পাথর থেকে শতাধিক পর্যটককে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বলিপাড়া, বাগানপাড়া, অন্তনীপাড়া, হিন্দুপাড়া ও মুসলিমপাড়ার ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে পৌঁছেছে খাদ্যসামগ্রী।
বান্দরবান শহরের ক্রাইক্ষ্যংপাড়ার ১২২টি পরিবারকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে বিজিবি পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। টেকনাফের কোনাপাড়ার ২০০টি পরিবারকে সহায়তা করেছে ৬৪ বিজিবি। আলীকদম, বলিপাড়া, কাপ্তাই, বাঘাইছড়ি, রামগড়, পেকুয়া, হবিগঞ্জ — প্রতিটি এলাকায় একের পর এক ব্যাটালিয়ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।
কক্সবাজারের পেকুয়ায় নাইক্ষ্যংছড়ি ব্যাটালিয়ন (১১ বিজিবি) বলিরপাড়া, আবাসন প্রকল্প ও মোরারপাড়া গ্রামের পাঁচ শতাধিক বানভাসি মানুষের হাতে পৌঁছে দিয়েছে রান্না করা খাবার, আর ৫১০টি পরিবারের মধ্যে বিতরণ করেছে চাল, ডাল, আলু, সয়াবিন তেল, চিড়া, পেঁয়াজ, গুড়, লবণ, হলুদ ও মরিচ। ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
হবিগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৫৫ বিজিবি) যোগ করেছে নতুন মাত্রা। বানিয়াচং উপজেলার সুজাতপুর ইউনিয়নের জলাবদ্ধ ও দুর্গম এলাকায় ড্রোনের মাধ্যমে আটকে পড়া মানুষের কাছে শুকনো খাদ্য ও নগদ সহায়তা পৌঁছেছে — দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর মানবিক সেবার এক অভিনব দৃষ্টান্ত। একই দিনে প্রায় ৪০০টি পরিবারকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, ওষুধ ও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ২০০টি পরিবারকে ত্রাণসামগ্রী এবং আরও ২০০টি পরিবারকে রান্না করা খাবার দেওয়া হয়েছে। কৃষকের জীবিকার কথাও ভাবা হয়েছে — পশু চিকিৎসক দল প্রায় ১৫০টি গবাদিপশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা দিয়েছে। প্রযুক্তি, চিকিৎসা, ত্রাণ ও মানবিকতা — চার উপাদানকে এক সূত্রে গেঁথে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে হবিগঞ্জ ব্যাটালিয়ন।
দায়িত্ব থামেনি ত্রাণ বিতরণে। বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়ক থেকে উপড়ে পড়া গাছ ও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে যোগাযোগ পুনরুদ্ধার করেছে বিজিবি। নাইক্ষ্যংছড়িতে ধসে পড়ার মুখে থাকা স্টিলের সেতু রক্ষায় রাতভর বালুর বস্তা ফেলে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগের খুঁটি মেরামতেও স্থানীয় প্রশাসনের পাশে দাঁড়িয়েছে তারা।
এই কাজগুলো ছোট নয়। একটি গাছ সরানো মানে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য পথ খুলে দেওয়া। একটি সেতু রক্ষা মানে কয়েকটি গ্রামের সঙ্গে দেশের সংযোগ অটুট রাখা। একটি ড্রোন উড়িয়ে খাদ্য পৌঁছানো মানে সময়ের বিরুদ্ধে একটি জীবনকে জিতিয়ে আনা।
অথচ এই বীরত্বগাথার জাতীয় টেলিভিশনের পর্দায় যতটা জায়গা প্রাপ্য ছিল, ততটা মেলেনি। দুর্গম পথ, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ, বিদ্যুৎ-ইন্টারনেট সংকট মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সংবাদ সংগ্রহকে কঠিন করে তোলে। যা কিছু দৃশ্যমান হয়, তার বেশিরভাগই সিটিজেন জার্নালিস্টদের মোবাইল ফোনে তোলা অপেশাদার ফুটেজ, যা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ায় কিন্তু মূলধারার প্রচারে প্রাপ্য গুরুত্ব পায় না। অথচ কম রেজুলেশনের সেই ফুটেজও, যাচাই ও প্রেক্ষাপটসহ, ইতিহাসের মূল্যবান দলিল হতে পারে। কারণ সংবাদ কেবল নান্দনিক দৃশ্য নয়, সংবাদ মানুষের জানার অধিকার।
বিজিবি এসব করছে প্রচারের জন্য নয়। নাইক্ষ্যংছড়ি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. ফয়জুল কবির জানিয়েছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত মানবিক সহায়তা অব্যাহত থাকবে। একই প্রত্যয় হবিগঞ্জ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. তানজিলুর রহমানেরও। তার ভাষায়, সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি দুর্গত মানুষের উদ্ধার, আশ্রয়, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা, যোগাযোগ পুনরুদ্ধার ও ত্রাণ নিশ্চিত করা বিজিবির দায়িত্বেরই অংশ। প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে বন্যার পানি পুরোপুরি না নামা পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলবে।
এখানেই লুকিয়ে বিজিবি আর সীমান্তের মানুষের সম্পর্কের আসল রসায়ন। যে সদস্য দুর্যোগের রাতে অসহায় বৃদ্ধকে কাঁধে তুলে আশ্রয়ে পৌঁছে দেন, সীমান্তে উত্তেজনার দিনে সেই সদস্যের পাশেই বুক চিতিয়ে দাঁড়ান স্থানীয় মানুষ। এই সম্পর্ক প্রশাসনিক নয়, এটি আস্থার সম্পর্ক, একসঙ্গে বিপদ মোকাবিলার সম্পর্ক।
বিজিবি তাই শুধু সীমান্তের নীরব প্রহরী নয়। কোনো রাতে উদ্ধারকর্মী, কোনো সকালে চিকিৎসক দলের সহযোদ্ধা, কোনো বিকেলে ড্রোনচালিত ত্রাণসেবার পথিকৃৎ। সীমান্তে তারা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতীক, দুর্যোগে কোটি মানুষের নির্ভরতার আরেক নাম।
বিশ্বকাপের উন্মাদনা থাকবে, উৎসব চলবে। কিন্তু সেই উৎসবের আড়ালে আরেকটি বাংলাদেশও আছে, যেখানে মানুষ এখনো বুকসমান পানিতে দাঁড়িয়ে, শিশুরা অপেক্ষা করছে এক প্যাকেট খাবারের জন্য। আর ঠিক সেখানেই, ক্যামেরার বাইরে, নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বিজিবির সদস্যরা। সেই লড়াইয়ের ছবি মূলধারার টেলিভিশন পর্দায় ঝকঝকে নয়, বড়জোর কারও মোবাইলে ধরা কাঁপা কাঁপা কয়েক সেকেন্ডের ফুটেজ। কিন্তু ইতিহাসের খাতায় সেই ছবির রেজুলেশনই সবচেয়ে উঁচু, সবচেয়ে অমলিন।