প্রহরীর ভারী বুটের আওয়াজ আর কারাগারের স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারের মাঝে এক নারী বসে আছেন। চুলগুলো অগোছালো, চোখেমুখে প্রচণ্ড ক্লান্তি, কিন্তু দৃষ্টিতে আগ্নেয়গিরির মতো তেজ। চারপাশ থেকে তখন ভেসে আসছে শ্লেষ আর উপহাসের সুর, ‘নারীরা কি পারবে? সমাজ কি মেনে নেবে?’ সেই একাকী নারী, এমেলিন প্যানখাস্ট, দেয়ালের ওপাশে তাকাতেই দেখছেন এক মিছিলে হাজার হাজার নারীর কণ্ঠ ‘আমাদের ভোট চাই!’ ঠিক যেন এক উত্তাল সমুদ্রের গর্জন। তিনি জানেন, আজকের এই দীর্ঘশ্বাসই কালকের স্বাধীনতার ভিত্তিপ্রস্তর হতে চলেছে।
অসহযোগের এক নতুন ভাষা
তৎকালীন ব্রিটিশ সমাজ যখন নারীদের ঘরোয়া জীবনের গণ্ডিতে আটকে রাখতে চেয়েছিল, তখন এমেলিন প্যানখাস্ট এক আমূল পরিবর্তনের ডাক দিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, অনুযোগ কিংবা মিনতি করে অধিকার পাওয়া যায় না। তিনি বেছে নিলেন রাজপথ, বেছে নিলেন অনশন। কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় পুলিশ তাকে আবারও গ্রেফতার করতে চাইলে তিনি চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘তোমরা আমাকে কারাগারে বন্দি করতে পারো, কিন্তু আমার কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে পারবে না!’ এই ধৃষ্টতাই ছিল সেই সময়কার রাজনীতির সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
শব্দ নয়, কাজ চাই
প্যানখাস্টের দর্শন ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ‘Words, not deeds’। তার নেতৃত্বে নারীরা যখন পার্লামেন্টের দিকে মিছিল নিয়ে যেত, তখন তারা বুঝতে পেরেছিল যে তারা কেবল নিজেদের অধিকারের জন্য লড়ছে না, তারা লড়ছে আগামীর প্রতিটি নারীর মর্যাদার জন্য। তিনি নিজেই একাধিকবার অনশন করে মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও তার দৃঢ়তা কমেনি। তিনি শিখিয়েছেন, অধিকারের লড়াইয়ে ব্যক্তিগত কষ্টের চেয়ে বড় লক্ষ্য হলো সামষ্টিক বিজয়।
ইতিহাসের পাতায় আজীবন বিদ্রোহ
এমেলিন প্যানখাস্ট আজ নেই, কিন্তু প্রতিটি ব্যালট বাক্সে তার পদচিহ্ন লেগে আছে। আজও যখন কোনো নারী নির্ভীকভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, তখন সেই প্রতিবাদের ছায়ায় ঘুরে ফিরে আসে প্যানখাস্টের সেই অদম্য রূপ। তিনি কেবল ব্রিটিশ ভোটাধিকারের নেত্রী ছিলেন না; তিনি ছিলেন সেই শিখা, যা একসময় অন্ধকারে নিমজ্জিত বিশ্বকে পথ দেখিয়েছিল। আজ যখন আমরা গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা বলি, তখন কি একবারও মনে পড়ে না, এই অধিকারের দাম কতটুকু ছিল?