বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে একটি ছোট কিন্তু স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। এই ছোট্ট মানচিত্রকে পরিকল্পনা, সততা, দক্ষতা এবং সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে পৃথিবীর অন্যতম উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা অসম্ভব নয়।
কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো—রাজনীতির ব্যর্থতা, ঔপনিবেশিক ধাঁচের আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা, প্রশাসনিক অদক্ষতা, দীর্ঘসূত্রতা, জবাবদিহির অভাব, বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা, আইনের অসম প্রয়োগ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নানা সীমাবদ্ধতা আমাদের সম্ভাবনাকে বারবার পিছিয়ে দিয়েছে।
পাশের দেশের প্রভাব নিয়ে অনেক আলোচনা হয়, কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—
নিজেদের ভুল, দুর্নীতি, স্বার্থের রাজনীতি এবং জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে আমরা কবে বের হব?
দেশের মানচিত্র, ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্বাধীনতা, সমাজ, সংস্কৃতি, পরিবার, ধর্ম ও রাষ্ট্রব্যবস্থা রক্ষার জন্য জনগণ ভোট দিয়ে সরকার নির্বাচন করে।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে— সরকারের কাজ কী?
স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রশাসন পরিচালনা করা।
দেশের বাস্তবতা, আবহাওয়া ও মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নয়ন পরিকল্পনা করা।
সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।
পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা।
অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও জনসেবা নিশ্চিত করা।
এর সঙ্গে আজকের পৃথিবীতে আরও একটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের নিরাপত্তা।
বিগত বছরগুলোতে এই খাতে কী হয়েছে, কোথায় কীভাবে অপচয়, অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে—এসব দেশের মানুষ দেখেছে এবং জানে। নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে শুধু সরকার বদল নয়, চিন্তা ও কাজের ধরনও বদলাতে হবে। কিন্তু যদি আবার আগের মতো একই নীতি, একই অনিয়ম, একই গোষ্ঠীর প্রভাব এবং একই ধরনের সিদ্ধান্ত চলতে থাকে, তাহলে জনগণ প্রশ্ন করবেই।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
যদি বিদ্যুৎ, জ্বালানি, খনিজসহ রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো একে একে বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে এত বড় সরকারি কাঠামো, প্রশাসন, আমলাতন্ত্র এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের উদ্দেশ্য কী?
বর্তমান যুগ প্রযুক্তির যুগ। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা আগের চেয়ে অনেক সহজ। তাই জনগণ জানতে চায়—জাতীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ জনগণের রাষ্ট্রের হাতে থাকবে, নাকি অন্য কারও হাতে?
মাননীয় বিদ্যুৎ মন্ত্রী মহোদয়,
বিদ্যুৎ খাতের কোনো ধরনের পার্ট নিয়ন্ত্রণও বেসরকারি খাতে দেবেন না। যদি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতই অন্যের হাতে তুলে দিতে হয়, তাহলে জনগণ প্রশ্ন করবেই—রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায়?
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ অবশ্যই রাষ্ট্রের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে এবং দেশীয় প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও দক্ষ জনবল দিয়ে পরিচালিত হতে হবে।
বাংলাদেশের মানচিত্র ছোট। তাই পরিকল্পনাও হতে হবে বাংলাদেশের বাস্তবতা অনুযায়ী, অন্ধ অনুকরণ নয়। নতুন কোম্পানি তৈরি করে বা নতুন নামে পুরোনো ব্যবস্থা চালিয়ে জাতীয় স্বার্থকে দুর্বল করা যাবে না।
জনগণের ও ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরের চাওয়া—
১ বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও সরবরাহের মূল নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি খাতে দেওয়া যাবে না।
২ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি খাতে দেওয়া যাবে না।
৩ জ্বালানি ক্রয়ে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে।
৪ রাষ্ট্রের কৌশলগত খাত রাষ্ট্রের হাতেই থাকতে হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ—
জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন। কোনো গোষ্ঠী স্বার্থ বা মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব নয়, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনা করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ খাতের সিদ্ধান্ত নিন।
জাতীয় সম্পদ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়— এটি বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের সম্পদ।
লেখক: প্রকৌশলী ও ব্যবসায়ি