Thursday 25 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

জলবায়ু সংকটে সরকারের দূরদর্শী উদ্যোগ

মো. শাহিন রেজা
২৫ জুন ২০২৬ ২০:২০

জলবায়ু সংকট পৃথিবীতে এখন অন্যতম আলোচ্য বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের তেমন ভূমিকা না থাকলেও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে দেশটি অবস্থান করছে। ইতোমধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের ধরনের পরিবর্তন, খরা, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদী ভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ জানান দিচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের জীবন ও জীবিকার উপর কতটা প্রভাব রাখছে। এখনই যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আমাদের দক্ষিণাঞ্চলে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। কৃষি, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও মানব জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ডব্লিউএমও-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচ বছরের গড় বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের (১৮৫০–১৯০০) তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা ৭৫ শতাংশ।
NASA এবং Copernicus ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের একটি তথ্য বলছে, গত কয়েক দশক ধরে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির গতি ক্রমাগত ত্বরান্বিত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বিগত ৩০ বছরে প্রতি দশকে প্রায় ০.২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে তাপমাত্রা বেড়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান ও মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারনে বাংলাদেশেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে। বিগত কয়েক বছর ধরে গ্রীষ্মকালে স্থায়ীত্ব ও তাপপ্রবাহের প্রবণতা অনেক বেড়েছে যা জলবায়ু পরিবর্তনের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির এই হার রোধ করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে বাংলাদেশকে। পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করতে বর্তমান সরকার আগামী পাঁচ বছরে পঁচিশ কোটি বৃক্ষ রোপণের উদ্যোগ নিয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারনে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের এই টেকসই পদক্ষেপ জনমনে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

আঠারো দশকের পর থেকে দ্রুত শিল্পায়ন হচ্ছে। অন্যদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনের তাগিদে জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার বেড়েছে। আবার অপরিকল্পিত নগরায়ন ও কলকারখানা নির্মাণে বন উজাড় করা হচ্ছে। ফলে প্রকৃতিতে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। যা জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে। এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বৃক্ষরোপণকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর একটি উপায় হিসেবে বিবেচনা করছেন। সরকারও বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে নির্বাচনের আগে বৃক্ষ রোপণ ও খাল খননের কথা জানিয়েছিলেন।

একটি দেশের মোট আয়তনের পঁচিশ শতাংশ বনাঞ্চল থাকা প্রয়োজন। কিন্তু জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রকৃত বন আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১৩.৫%। ফলে বৃক্ষ রোপণ কার্যক্রম সফল ভাবে শেষ করতে পারলে বনায়নের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। বর্ষাকালকে বৃক্ষ রোপণের উপযুক্ত সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সরকারের সাথে ব্যক্তি পর্যায়ে বৃক্ষ রোপণ ও সংরক্ষণের করার উদ্যোগ নিলে সম্মিলিত ভাবে আমরা এই দূর্যোগ মোকাবিলা করতে পারবো। কারন গাছ হচ্ছে প্রকৃতির নিজস্ব কার্বন শোষণকারী ব্যবস্থা।

বৃক্ষ বা বনভূমিকে পুরো পৃথিবীর ফুসফুস বলা হয়।গাছপালা ও বনভূমি বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং বিশুদ্ধ অক্সিজেন ছেড়ে দেই।একটি পরিপূর্ণ বৃক্ষ বছরে ৯ হাজার কেজি অক্সিজেন উৎপাদন এবং ৭ হাজার কেজি কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে পারে। অর্থাৎ বলা যায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ তার জীবনকালে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। অন্য দিকে গাছপালা স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা করে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব রিমোট সেন্সিং অ্যান্ড জিআইএসের এক গবেষণার তথ্য মতে, ঢাকার অদূরে সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ শতাংশ এলাকায় গাছপালা ও ২২ শতাংশে জলাভূমি । এ কারণে একই সময় ঢাকার চেয়ে সেখানকার তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম থাকে। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রমনা পার্ক এলাকার তুলনায় ঢাকার বাণিজ্যিক এলাকায় তাপমাত্রার থাকে ২ ডিগ্রি বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়টির অর্ধেক এলাকাজুড়ে থাকা ২৭ হাজার গাছ ও প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকায় থাকা জলাভূমি তাপমাত্রা কম থাকার পেছনে ভূমিকা রাখছে। এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরে ১৯৮৯ থেকে ২০২০ সাল, অর্থাৎ ৩১ বছরে ৫৬ শতাংশ গাছপালা কমেছে (প্রথম আলো, ২০২৪)। ফলে বৃক্ষ রোপণের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে পারলে তাপমাত্রা অনেকটা কমানো যাবে। দেশের মানুষের বসবাসকে আরামদায়ক, জীব বৈচিত্র্য রক্ষা, ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব মোকাবিলা করে সবুজ বাংলাদেশ গড়তে বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের গুরুত্ব সরকারের সাথে জনগণকেও অনুধাবন করতে হবে।

আগামী পাঁচ বছরে কয়েক কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য শুধু পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনেই ভূমিকা রাখবে না বরং এটি কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও একটি নিরাপদ বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ার প্রয়াশ। তবে রোপিত গাছের যথাযথ পরিচর্যা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জও কম নয়। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে সরকার ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করতে হবে। বৃক্ষ রোপণে স্থানীয় প্রজাতির গাছকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। কারণ দেশি প্রজাতির গাছে তাপমাত্রা বেশি কমে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সরকারের এই লড়াই ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সফল ভাবে বাস্তবায়নে আমাদেরও যথাযথ ভুমিকা রাখতে হবে।

লেখক: অফিসার, ইউএস বাংলা মেডিকেল কলেজ, নারায়ণগঞ্জ