চট্টগ্রাম ব্যুরো : ৯২ বছর আগে ব্রিটিশ পুলিশের অস্ত্রাগার লুট করে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ঘোষণার দিনে অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের স্মরণ করেছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংগঠন। পাঠ্যপুস্তকে সেই যুব বিদ্রোহের ইতিহাস তুলে ধরার দাবি জানিয়েছেন এসব সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
অসীম সাহসে সেই যুব বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয়া বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের আবক্ষ মূর্তিতে শ্রদ্ধা জানায় চট্টগ্রাম জেলা যুব ইউনিয়ন, ছাত্র ইউনিয়ন, বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার স্মৃতি পরিষদ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাস্দ (মার্ক্সবাদী), সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টসহ আরও বিভিন্ন সংগঠন।
সোমবার (১৮ এপ্রিল) নগরীর যাত্রা মোহন সেন হল প্রাঙ্গনে বিপ্লবীদের স্মরণে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লব ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার শপথ নেন।
গবেষক জামাল উদ্দিনের লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম শহর’-বইয়ে ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের’ বিষয়টি উল্লেখ আছে। সেখানে লেখা হয়েছে- ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল। ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির (বিপ্লবীদের গঠিত সংগঠন) চট্টগ্রাম শাখার সর্বাধিনায়ক মাষ্টারদা সূর্য সেন বিপ্লবী বাহিনী নিয়ে বৃটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। বিপ্লবীরা দামপাড়া পুলিশ লাইন্স আক্রমণ করে অস্ত্রাগার থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র লুট করে। মাস্টারদা সেখানেই ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন এবং স্বাধীন ভারতের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন।
অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পর রাত পেরোতেই বিপ্লবীরা চট্টগ্রাম শহর ত্যাগ করেন। জালালাবাদ পাহাড়সহ বিভিন্ন গোপন আস্তানায় আশ্রয় নেন। এরপর চারদিন স্বাধীন ছিল চট্টগ্রাম। পরে ২২ এপ্রিল জালালাবাদ পাহাড়ে বৃটিশ বাহিনীর সঙ্গে বিপ্লবীদের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। তিন ঘণ্টার সেই যুদ্ধে ৭০ থেকে ১০০ জন ব্রিটিশ সৈন্য নিহত হয় এবং ১২ জন বিপ্লবী শহিদ হন।
অস্ত্রাগার লুণ্ঠনে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে বিপ্লবীদের মধ্যে ছিলেন গণেশ ঘোষ, লোকনাথ বল, নির্মল সেন, অনন্ত সিং, অপূর্ব সেন, অম্বিকা চক্রবর্তী, নরেশ রায়, ত্রিপুরা সেনগুপ্ত, বিধুভূষণ ভট্টাচার্য, শশাঙ্কশেখর দত্ত, অর্ধেন্দু দস্তিদার, হরিগোপাল বল, প্রভাসচন্দ্র বল, তারকেশ্বর দস্তিদার, মতিলাল কানুনগো, জীবন ঘোষাল, আনন্দ গুপ্ত, নির্মল লালা, জিতেন দাসগুপ্ত, মধুসূদন দত্ত, পুলিনচন্দ্র ঘোষ, সুবোধ দে, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এবং কল্পনা দত্ত। এদের সঙ্গে সুবোধ রায় নামে ১৪ বছরের এক কিশোরও ছিলেন।
যুব ইউনিয়ন
বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের আবক্ষ মূর্তিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় চট্টগ্রাম জেলা যুব ইউনিয়নের প্রীতম দাশ, রাশিদুল সামির, বিপ্লব দাশ, মিঠুন বিশ্বাস, রবিশংকর সেন নিশান, অভিজিৎ বড়ুয়া ছিলেন।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে যুব ইউনিয়নের নেতারা বলেন, ব্রিটিশবিরোধী যুব বিদ্রোহের অনুপ্রেরণাই পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনকে ত্বরান্বিত করেছিল। সেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক জালালাবাদ পাহাড়টি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। সেখানে শহিদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করতে হবে।
ছাত্র ইউনিয়ন
যুব বিদ্রোহ দিবসে অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় চট্টগ্রাম জেলা ছাত্র ইউনিয়ন। এরপর সংক্ষিপ্ত সমাবেশে জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি এ্যানি সেন, সাধারণ সম্পাদক ইমরান চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি গোরচাঁদ ঠাকুর বক্তব্য দেন।
ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা বলেন, ‘ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত চট্টগ্রামের জালালাবাদ পাহাড়ে এখনো কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়নি। যুব বিদ্রোহের সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। সর্বস্তরে পাঠ্যপুস্তকে এই ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’
মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত, তারকেশ্বর দস্তিদারসহ বিপ্লবের মহানায়কদের স্মরণে বন্দরনগরীর প্রধান সড়কগুলোর নামকরণের দাবি জানান তারা।
বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার স্মৃতি পরিষদ
মাস্টারদা সূর্য সেনের আবক্ষ মূর্তিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার স্মৃতি পরিষদের উপদেষ্টা বিজয় শংকর চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক সিঞ্চন ভৌমিক, অর্থ সম্পাদক তপন ভট্টাচার্য্য, রুবেল পাল, প্রীতিলতা ট্রাস্টের ট্রাস্টি বিশ্বজিত কুমার দেব, সদস্য দেবাশীষ দে, মিশন দাশগুপ্ত, মহিলা সদস্য নীতি চেীধুরী, রানা চৌধুরী , সদস্য সচিব সজল শিকদার , শ্যামল চক্রবর্তী ছিলেন।
শ্রদ্ধা নিবেদনের পর আলোচনা সভায় সংগঠকরা বলেন, বিপ্লবীদের স্মৃতিগাঁথা কোনো দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হয় না। ফলে নতুন প্রজন্ম বিপ্লবীদের গৌরবগাঁথা ইতিহাস সম্পর্কে কিছুই জানে না। অথচ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনে একইসূত্রে গাঁথা। সম্প্রতি আমরা দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, পুলিশ দামপাড়ায় সেই অস্ত্রাগারে একটি জাদুঘর নির্মাণ করেছে। জাদুঘরের নাম দেয়া হয়েছে- পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। নামের মাধ্যমে যুব বিদ্রোহের ইতিহাস আড়াল করে ফেলেছে পুলিশ। কারও মতামত না নিয়ে একতরফাভাবে পুলিশ এ নামকরণ করেছে। আমরা জাদুঘরের নামে যুব বিদ্রোহের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানাই।