চট্টগ্রাম ব্যুরো: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ সম্পন্ন করেছেন। চাকরি কিংবা ব্যবসাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার কথা। কিন্তু তিনি পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন প্রতারণাকে। ব্যবসায়ী সেজে পণ্য সরবরাহের কথা বলে সেই পণ্য আত্মসাৎ করে বিক্রি করে দেন। টাকা ফেরত দেওয়ার প্রয়োজন হলে নিজেই বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তা সেজে জাল স্লিপ-সিল ব্যবহার করে প্রতারণার জাল বোনেন। এমনকি ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট অ্যাপস থেকে পাঠানো মেসেজ এডিট করেও প্রতারণা করেছেন এই ব্যক্তি।
এভাবে প্রতারণার মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিলেও শেষ পর্যন্ত নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি মজিবুর রহমান হান্নান (২৮) নামে এই ব্যক্তি। সোমবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সকালে চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থানার ঝাউতলা এলাকার এসবি নগরে নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করেছে পতেঙ্গা থানা পুলিশ।
পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন সারাবাংলাকে জানান, ম্যাক্স গ্রুপের একটি কারখানার প্রায় চার মেট্রিকটন এমএস প্লেট আত্মসাতের অভিযোগে পতেঙ্গা থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারের পর মজিবুরের বহুমুখী প্রতারণার চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে আসছে। পুলিশের কাছে তিনি দাবি করেছেন, বিদেশ পাঠানোর কথা বলে তার কাছ থেকে একজন আট লাখ টাকা নিয়ে আত্মসাৎ করেন। সেই লোকসান পূরণে তিনি সাম্প্রতিক প্রতারণা শুরু করেছেন।
মজিবুর রহমান হান্নানের বাড়ি ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার শুভপুর গ্রামে। তিনি চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ সম্পন্ন করে পণ্যবাহী পরিবহনের ভাড়া মধ্যস্থতাকারীর (ব্রোকার) ব্যবসায় নামেন।
গত ১১ জানুয়ারি নগরীর পতেঙ্গায় ম্যাক্স গ্রুপের একটি ইয়ার্ড থেকে ১৭ মেট্রিক টন ৩১০ কেজি এমএস প্লেট মানিকগঞ্জে ম্যাক্স ইনফ্রা কারখানায় নিয়ে যাওয়ার জন্য মজিবুরের মাধ্যমে দুটি ট্রাক ভাড়া করা হয়। চট্টগ্রাম নগরীতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজে নিয়োজিত ম্যাক্স গ্রুপের কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম ট্রাক দুটি ভাড়া করেন। ওইদিন সন্ধ্যা ৭টায় ট্রাক দুটি পতেঙ্গা থেকে রওনা দেয়। পরদিন ১৩ টন ১৫০ কেজি এমএস প্লেট নিয়ে একটি ট্রাক কারখানায় পৌঁছে। তবে ৪ টন ১৬০ কেজি প্লেটবাহী আরেকটি ট্রাক সময়মতো পৌঁছায় আশরাফুল মজিবুরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
ওসি কবির হোসেন বলেন, ‘মজিবুর প্রথমে ট্রাকটি নষ্ট হয়েছে বলে জানায়। দুইদিন পর আবার জানায়, চালক মালগুলো অন্য কোথাও বিক্রি করে পালিয়ে গেছে। তবে সে দাম পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেয়। ম্যাক্সের পক্ষ থেকে তাকে ইউসিবিএল ব্যাংকের হিসাব নম্বর দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর মজিবুর সিটি ব্যাংকের অ্যাপস থেকে আসা ফান্ড ট্রান্সফারের একটি মেসেজের স্ক্রিনশট দেয় তাদের। কিন্তু বাস্তবে তাদের অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা জমা হয়নি। এদিকে তার মোবাইলও বন্ধ। আশরাফুল থানায় মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার ভিত্তিতে মজিবুরকে গ্রেফতারের পর তার বাসায় তল্লাশি করে পাওয়া যায় ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখার জাল স্লিপ ও সিল।’
এদিকে মজিবুরকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে প্রতারণার আরও চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পতেঙ্গা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শাহাদাত হোছাইন জানিয়েছেন, প্রায় পাঁচ লাখ টাকা মূল্যের আত্মসাত করা এমএস প্লেট মজিবুর চট্টগ্রামের সাগরিকা এলাকার আলী কাটিং ওয়ার্কস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করেছিলেন। তবে বিক্রি করতে গিয়েও তিনি জালিয়াতি করেন। আগ্রাবাদের মেসার্স হোসেন ট্রেডিং করপোরেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানের প্যাডে ভূয়া ক্রয় রশিদ, ডেলিভারি চালান, ওয়েবিল ও কম্পিউটার স্কেল স্লিপ তৈরি করে প্লেটগুলো বিক্রি করেন।
‘মামলা তদন্ত করতে গিয়ে আমরা নগরীর সিটি গেইটের নিউ বিসমিল্লাহ ফার্ণিচার এন্টারপ্রাইজের মালিক আলমগীরের সঙ্গে তার বেশ কয়েকবার মোবাইলে কথোপকথনের তথ্য পাই। পরে জানতে পারি, ওই ব্যক্তিও মজিবুরের প্রতারণার শিকার। খাট সরবরাহের কথা বলে তার কাছ থেকে ৮০ হাজার টাকা নেন। কিন্তু পরে সেটা সরবরাহ না করে একই প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে সেই টাকা আত্মসাত করেন। আকবর শাহ থানায় মজিবুরের বিরুদ্ধে এ ঘটনায় মামলা আছে’- বলেন এসআই শাহাদাত।
ওসি কবির হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘মজিবুর ম্যাক্সকে গাড়ি সরবরাহ করছে পাঁচবছর ধরে। এতদিন তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল না। সম্প্রতি সে নানা প্রতারণায় জড়িয়েছে। তার প্রতারণার পদ্ধতিও একই। পণ্য সরবরাহের নামে প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং সেই টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে ব্যাংকের ভূয়া স্লিপ ও এডিট করা মেসেজ দিয়ে আবার প্রতারণা। সম্প্রতি আট লাখ টাকা লোকসান হওয়ায় সেই ঘাটতি পূরণে সে প্রতারণা শুরু করেছে বলে আমাদের জানিয়েছে।’
বিভিন্ন ব্যাংকের জাল স্লিপ ও সীল ব্যবহার করে ক্যাশ অফিসার সেজে প্রতারণার অভিযোগে এসআই শাহাদাত বাদী হয়ে নগরীর খুলশী থানায় মজিবুরের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা দায়ের করেছেন।