Wednesday 08 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

সব বিন্দুতেই মিলে যাচ্ছে অর্পা-অর্থীর জীবন!

রাহাতুল ইসলাম রাফি, ঢাবি করেসপন্ডেন্ট
৮ ডিসেম্বর ২০২১ ২০:৪৫ | আপডেট: ৯ ডিসেম্বর ২০২১ ০৯:৩৩

কিছু ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা হয় না। দুই দুইয়ে চার মেলানো যায় না। একটি ঘটনার সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে আরেকটি ঘটনা— কার্যকারণের সূতোয় বাঁধা যায় না এমন অনেক ঘটনাই। শেষ পর্যন্ত নিছক ‘কাকতালীয়’ উপাধিই জোটে।

একের পর এক এমনই অদ্ভুত মিলের ঘটনা জন্ম দিয়ে চলেছেন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার দুই জমজ বোন অতুন হক অর্থী ও অবনী হক অর্পা। যমজ বলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের জন্ম তারিখ এক। সেখানে বিস্ময়ের কিছু নেই। তবে স্কুলজীবন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা পর্যন্ত দুই বোন যে নজির রেখে চলেছেন, তাতে বিস্মিত না হয়ে উপায়ও নেই।

ঘটনা বুঝতে একটু পেছন ফিরে দেখা যাক। স্কুলের প্রধান শিক্ষক আমিনুল হক ও সরকারি চাকরিজীবী লাভলী ইয়াস‌মি‌ন দম্পতির ঘর আলো করে জন্ম নেয় জমজ সন্তান অর্পা ও অর্থী। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত তাদের পড়ালেখা সিরাজগঞ্জের দক্ষিণ পুস্তিগাছা বনানী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে। নবম শ্রেণিতে দু’জনেরই ভর্তি সিরাজগঞ্জের সবুজ কানন উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে।

বিজ্ঞাপন

অর্থী-অর্পা মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেয় ২০১৮ সালে। ফলপ্রকাশের পর জানা গেল, দু’জনের জিপিএ একই— ৪.৯৪। এরপর উচ্চ মাধ্যমিকেও একই বিন্দুতে অর্পা-অর্থী। এবার ভর্তি হন সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজে। উচ্চ মাধ্যমিকেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি— দু’জনেই পেয়েছেন জিপিএ ৫।

এখানেই কাকতালের শেষ নয়। উচ্চ মাধ্যমিকের পাঠ চুকিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পথে আরও কাকতালের জন্ম দিয়েছেন দুই বোন। মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী দুই বোন গত ২ অক্টোবর বসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদভুক্ত ‘খ’ ইউনিটের পরীক্ষায়। ঠিক একমাস পর ২ নভেম্বর প্রকাশ পায় ভর্তি পরীক্ষার ফল। তাতেও বিস্ময়— দুই বোনেরই স্কোর ৫৩! এসএসসি-এইচএসসি’র রেজাল্ট একই হওয়ায় এই ইউনিটে দু’জনেরই মোট স্কোর ৭২.৮৮! সুযোগ নেই বলেই শেষ পর্যন্ত মেধাক্রমটা মিলে যাওয়া সম্ভব হয়নি, সেখানে দু’জন পাশাপাশি— ১৬৩৬ ও ১৬৩৭।

দুই বোন অর্পা ও অর্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে

দুই বোনের শিক্ষাজীবনের এমন প্রতিবিম্বিত সামঞ্জস্য শেষ হচ্ছে না এখানেই। ভর্তি পরীক্ষার ফলপ্রকাশের পর যে সাক্ষাৎকার, সেখানেই তো বিষয় নির্বাচন। গতকাল মঙ্গলবার (৭ ডিসেম্বর) ঢাবি কলা অনুষদে সেই সাক্ষাৎকারে অংশ নেন অর্পা-অর্থী। বোর্ডের সামনে দুই বোন সিদ্ধান্ত নেন— ভাষাবিজ্ঞান বিভাগেই পড়বেন তারা। মেধাক্রম অনুযায়ী সেই সুযোগও পেয়েছেন দু’জনেই। এখন দেখার বিষয়, বিভাগীয় পরীক্ষাগুলোতেও দুই বোনের একই ফলাফলের ধারাবাহিকতা কতটুকু থাকে!

বারবারই শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন ধাপে দুই বোনের একবিন্দুতে দাঁড়িয়ে যাওয়ার ঘটনায় উচ্ছ্বসিত দুই বোনও। সারাবাংলার সঙ্গে আলাপে দুই বোনই জানিয়েছেন তাদের আবেগভরা উচ্ছ্বাসের কথা।

জানতে চাইলে শুরুতেই অতুন হক অর্থীর এক লাইনের জবাব, ‘এই অনুভূতি ভাষায় ব্যক্ত করার মতো নয়।’ আরেকটু সময় নিয়ে আলাপচারিতায় তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘সবসময় পরপর সিরিয়াল থাকত আমাদের। অর্পা ফার্স্ট হলে আমি সেকেন্ড হতাম, আমি ফার্স্ট হলে অর্পা সেকেন্ড হতো। ক্লাস ফোরে আমি ফার্স্ট ছিলাম। ফাইভে ওঠার সময় এক নম্বরের ব্যবধানে অর্পা ফার্স্ট হয়, আমি হই সেকেন্ড।’

আরেক বোন অবনী হক অর্পার কাছে এসব ঘটনা সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে উপহার, মিরাকলের মতো। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি খুব আনন্দিত। আমরা সবসময় একসঙ্গে পড়ালেখা করেছি। আমাদের লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। একই স্কোর, একই পজিশন নিয়ে একই বিভাগের ভর্তির সুযোগ— সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে মিরাকল ছাড়া আর কীই বা বলতে পারি! তবে এমন ঘটনা আমাদের জন্য সত্যিই অনেক আনন্দদায়ক। অনেক বড় পাওয়া। এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।’

সারাবাংলার সিরাজগঞ্জ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট রানা আহমেদ অর্পা-অর্থীর বাড়িতে গিয়ে দেখা পান তাদের বাবা এস এম আমিনুল হকের। দক্ষিণ পুস্তিগাছা বনানী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তিনি। জানিয়েছেন, তার জমজ দুই মেয়ে ছোটবেলা থেকেই গল্প-কবিতা ও ছড়ার বই পড়ত।

আমিনুল হক সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠানেই দুই মেয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে। ওরা যখন অষ্টম শ্রেণিতে, আমার মনে হলো ওদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হলে আরও ভালো স্কুলে পড়ালেখা করা প্রয়োজন। সিরাজগঞ্জ সবুজ কানন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি করলাম। মাধ্যমিকের পর দুই বোনকে ভর্তি করি সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজে। উচ্চ মাধ্যমিকেও ওরা ভালো করেছে। বিশ্বাস ছিল, ভর্তি পরীক্ষাতেও ভালো করবে।’

অর্পা ও অর্থীর ছোটবেলা থেকেই পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই পড়ার ঝোঁকের কথা জানালেন সহপাঠী সাদিয়া সুলতানা সুমিও। তিনি বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকে একসঙ্গেই বড় হয়েছি। স্কুল থেকে শুরু করে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ পর্যন্ত আমরা একসঙ্গে পড়ালেখা করেছি। ওরা জমজ দুই বোন পড়ালেখায় খুব মনোযোগী ছিল। শুধু তাই নয়, ওদের বাসায় ছোট একটি লাইব্রেরিও ছিল। আমি মাঝে মধ্যে ওদের বাসায় গিয়ে দেখতাম, তারা দুই বোন বিভিন্ন ধরনের বই পড়ছে। কলেজ ক্যাম্পাসে সবাই যখন আড্ডা দিত, জমজ দুই বোন তখন পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকত। ওরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে, এটি নিঃসন্দেহে আনন্দের একটি খবর।’

অর্পা ও অর্থী দু’জনেই বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি), গুচ্ছ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তবে বাবা আমি আমিনুল হকের ইচ্ছা, তার দুই মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন। তাই অন্য কোথাও ভর্তি না করিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই দুই মেয়েকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন তিনি।

আমিনুল হক বলেন, ‘আমার দুই মেয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যায়ে চান্স পেয়েছিল। পরে আমার মনে হয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালে আরও ভালো হবে। তাই তাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিই।’

উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নারীদের পক্ষে কাজ করবে, সমাজের অন্যায়-অনিয়ম-দুর্নীতি, বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কাজ করবে— দুই মেয়ের কাছে এমনটিই প্রত্যাশা আমিনুল হকের।

অতুন হক অর্থী ও অবনী হক অর্পা ক’দিন পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের শ্রেণিকক্ষে বসবেন একসঙ্গে। জীবনের অন্যান্য বাঁকের মতো এই বাঁকেও তারা মিলে গেছেন একই বিন্দুতে। এখন দেখার পালা— ভবিষ্যতে আরও কোন কোন জায়গায়  তাদের এই মিলে যাওয়া বিন্দুর নতুন গল্প তৈরি হয়!

সারাবাংলা/আরআইআর/টিআর