ঢাকা: ২০০২ সালের ১০ নভেম্বর রাতে লাশ উদ্ধার করা হয় মডেল সৈয়দা তানিয়া মাহবুব তিন্নির (২৪)। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের পেরিয়ে গেছে ১৯টি বছর। পত্রিকার খবর দেখে রায় শুনতে এসে তিন্নির বাবা সৈয়দ মাহবুব করীম জানালেন, কন্যার শোকে আজও বিয়ে করেননি তার চাচা সৈয়দ রেজাউল করীম। একটি রাতের জন্যও ঘুমাতে পারেননি।
তিনি বলেন, তিন্নির মৃত্যুর পর আমাদের স্বপ্ন-সংসার সব ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। মেয়ের জন্মের পর থেকে ওর চাচাই ওকে বড় করেছে। চাচাকে আব্বা বলে ডাকতো তিন্নি। তিন্নির মৃত্যুর পর থেকে ওর চাচা একরাতের জন্যও পরম শান্তিতে ঘুমাতে পারেনি। মেয়েকে হারিয়ে আমরা বাকরুদ্ধ।
হত্যাকাণ্ডের ১৯ বছর পর মামলাটির রায় ঘোষণার জন্য সোমবার (১৫ নভেম্বর) দিন ধার্য করেছিলেন আদালত। মামলার রায় শুনতে আদালতে ছুটি আসেন নিহতের বাবা সৈয়দ মাহবুব করীম ও চাচা সৈয়দ রেজাউল করীম। কিন্তু তিন্নির বাবা ও চাচার সাক্ষ্যগ্রহণ অসমাপ্ত থাকায় রায়ের তারিখ পিছিয়ে পুনরায় সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী বছরের ৫ জানুয়ারি দিন ধার্য করেন ঢাকার সপ্তম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ কেশব রায় চৌধুরী।
রায় ঘোষণার তারিখ পেছানোর পূর্বে তিন্নির চাচা সৈয়দ রেজাউল করিম জানান, পাবলিক প্রসিকিউটর আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। আমরা একটি পত্রিকায় রায় ঘোষণার খবর দেখে আজ আদালতে এসেছি। এসেই জানতে পারলাম আমাদের পুনরায় সাক্ষ্য দিতে হবে।
মামলার বাদী নিহত তিন্নির বাবা সৈয়দ মাহবুব করীম সারাবাংলাকে বলেন, আদালতের প্রতি আমার আস্থা আছে। আদালত যে রায় দিবে আমরা মেনে নেব। তবে রায়টি যেন শাস্তিযোগ্য হয়। ন্যায়বিচার হয়। আজকে যে রায় হবে তা আমরা জানতাম না? একটা দৈনিক পত্রিকার খবর দেখে ছুটে এসেছি। আদালত থেকে কোনো কাগজপত্র পাঠায়নি। কোনো যোগাযোগও করেননি।
তিনি জানান, রায় ঘোষণার আগে আদালত বলেন, সাক্ষ্যগ্রহণ তো পুরোপুরি হয়নি, আংশিক হয়েছে। মামলাটি উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ থাকায় সেই সময়ে সম্পূর্ণ সাক্ষ্য দেওয়া সম্ভব হয়নি। এরপর বিচারক আমাকে জিজ্ঞেসা করেন, আপনি কি সম্পূর্ণ সাক্ষ্য দিতে চান, তখন আমি হ্যাঁ বলি। এরপর আমরা রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য পিটিশন দিই। একই ফোন নম্বর, ঠিকানা থাকার পরেও কেন আদালত থেকে কাগজ আসল না, সেই বিষয়টি আমার জানা নেই।
তিনি আরও জানান, তিন্নিকে যখন হত্যা করা হয়, তখন তার দেড় বছর বয়সী সন্তান ছিল। তার নাম আনুশকা। আনুশকা তার বাবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে আছে। মাকে হত্যার বিষয়ে সে কিছুই জানেন না। তাকে এসব ঘটনা থেকে দূরে রাখা হয়েছে। সর্বশেষ ২০১০ সালে একবার কথা হয়েছে। আর কথা হয়নি। এখন তার বয়স ২০ বছর হয়ে গেছে।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তিন্নির মৃত্যুর পর আদালত আসা নিয়ে একটা ভয় ছিল। সেটা এখন আর নেই। তিন্নি হত্যার ন্যায়বিচার (সর্বোচ্চ সাজা) দাবি করেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর ভোলা নাথ দত্ত জানান, মামলাটির দীর্ঘদিন হাইকোর্টে স্থগিতাদেশে ছিল। এজন্য সাক্ষ্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। বয়স্ক মানুষ আদালতে আসছেবন। বিজ্ঞ আদালতে বলেছেন সাক্ষী দেবেন। যেহেতু বিষয়টি চাঞ্চল্যকার। মামলার বাদী যদি সাক্ষ্য দিতে চাই, আমরা গ্রহণের জন্য আবেদন করি। আদালত থেকে যথাযথ সময়ের সমন দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তারা বলছেন পাননি।
অপরদিকে রাষ্ট্র নিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী শাহ ইলিয়াস রতন বলেন, আদালত সাক্ষ্যগ্রহণ করতে চাইলে আমাদের আবারও জেরা করতে হবে। আশা করি, এই মামলায় আসামি খালাস পাবেন।
মামলার অভিযোগ থেকে জানা গেছে, কেরানীগঞ্জের বুড়িগঙ্গা নদীর ১ নম্বর চীন মৈত্রী সেতুর ১১ নম্বর পিলারের পাশে ২০০২ সালের ১০ নভেম্বর রাতে মডেল তিন্নির লাশ পাওয়া যায়। পরদিন অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে মামলা করেন কেরানীগঞ্জ থানার তৎকালীন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. সফি উদ্দিন। পরে ২০০২ সালের ২৪ নভেম্বর তদন্তভার সিআইডিতে ন্যস্ত হয়।
এরপর মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পান সিআইডির পরিদর্শক সুজাউল হক, সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) গোলাম মোস্তফা, এএসপি আরমান আলী, এএসপি কমল কৃষ্ণ ভরদ্বাজ এবং এএসপি মোজাম্মেল হক। সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা মোজাম্মেল হকই ২০০৮ সালের ৮ নভেম্বর সাবেক ছাত্রনেতা ও সাংসদ গোলাম ফারুক অভিকে একমাত্র আসামি করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।
২০১০ সালের ১৪ জুলাই অভির বিরুদ্ধে চার্জগঠন করেন আদালত। এরপর চার্জশিটভূক্ত ৪১ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৮ জনের সাক্ষ্য গ্রহন করেন আদালত।