চট্টগ্রাম ব্যুরো: যুদ্ধরত সেনাবাহিনীর সেক্টর কমান্ডারের কাছে আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের একদিন আগেই চট্টগ্রামের জনতা পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে ফেলেছিল। একদিন আগেই ১৬ ডিসেম্বর তৎকালীন চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে জনতা তুলেছিল সদ্য স্বাধীন দেশের লাল-সবুজ পতাকা। এর পরদিন ১৭ ডিসেম্বর এক নম্বর সেক্টরের কমান্ডার সেনাবাহিনীর মেজর রফিকুল ইসলামের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, আনুষ্ঠানিকভাবে তোলা হয় লাল-সবুজের পতাকা।
‘বিজয়ের শেষ তিনদিন কেমন ছিল’ শীর্ষক এই গোলটেবিল আলোচনায় এই তথ্য দিয়ে চট্টগ্রামের রণাঙ্গনের সেদিনের বীর সেনানিরা বলেছেন, ‘যুদ্ধদিনে জনগণের অবদান সবার ওপরে।’
বিজয়ের দিবসকে সামনে রেখে শুক্রবার (১৩ ডিসেম্বর) সকালে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল খালেক মিলনায়তনে এই গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)। আলোচনায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনগুলোর স্মৃতিকথা তুলে ধরেন চট্টগ্রামের ১১ জন সেনানী। রণাঙ্গনের বীর যোদ্ধারা বিজয়ের মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কেউ আবেগাপ্লুত হয়েছেন, কেউ শত্রু মোকাবিলার বীরত্বগাঁথা গর্বের সঙ্গে শুনিয়েছেন কিশোর-তরুণদের। দর্শক সারিতে ছিলেন অধিকাংশ বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী।
আলোচনার উদ্বোধন করেন চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। বাসস, চট্টগ্রাম অফিসের প্রধান কলিম সরওয়ারের সঞ্চালনায় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধের গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ডা. মাহফুজুর রহমান, মো. হারিছ, জাহাঙ্গীর চৌধুরী, আবু সাঈদ সর্দার, এবিএম খালেকুজ্জামান দাদুল, মো. মঈনউদ্দিন, মোহাম্মদ সাহাবউদ্দিন, ফেরদৌস হাফিজ খান, মোজাফফর আহমেদ, রেজাউল করিম চৌধুরী ও মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু।
মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে দুইটা গ্রুপে ভাগ হয়েছিল। একটা বিএলএফ, আরেকটা এফএফ। চট্টগ্রাম শহরে বিএলএফ’র গ্রুপ ছিল ৮টি এবং এফএফ ছিল ১৭টি। নভেম্বরে এসে একটি যৌথ হাইকমান্ড হয়েছিল। এর কমান্ডার ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার আফসার উদ্দিন। ডেপুটি কমান্ডার ছিল মৌলভী সৈয়দ, আমি মাহফুজুর রহমান, ইঞ্জিনিয়ার হারুন, ডা. জালাল, কাট্টলীর শাহাবুদ্দিন। শহরে মুক্তিযোদ্ধাদের একটা গ্রুপের নেতৃত্বে ছিল মৌলভী সৈয়দ, আরেকটা গ্রুপে আমি।’
‘চট্টগ্রাম শহরে সব মিলিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা চারশ’রও বেশি অপারেশন করেছেন। হাইকমান্ডের নির্দেশে শেষদিকে একটা অপারেশন হয়েছিল। এটা ডিসেম্বরের ১ তারিখ। সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট থেকে আমিন জুট মিল হয়ে কালুরঘাট জুট মিল পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় একইদিনে একইসময়ে ১০০টা অপারেশন হয়েছিল। ১৪ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমাদের দুই গ্রুপের মধ্যে একটু গোলমাল হয়। আমরা ভাবতাম মৌলভী সৈয়দের গ্রুপ আমাদের ওপর আক্রমণ করবে, তারা ভাবত আমরা তাদের ওপর আক্রমণ করব। পরে মঈনউদ্দিন খান বাদল ভাই (প্রয়াত) একদিন দুই গ্রুপের সঙ্গে বৈঠক করে মিলিয়ে দিলেন।’
মাহফুজুর রহমান আরও বলেন, ‘আমরা যারা সেদিন যুদ্ধে গিয়েছিলাম, আমাদের বুকে বুলেট বিদ্ধ হবে জেনেই গিয়েছিলাম। তবে আমাদের জনগণের অবদান যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি। তারা আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, খাবার দিয়েছে, তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছে। জনগণ যদি যুদ্ধের সঙ্গে একাত্ম না থাকত, তাহলে দেশ স্বাধীন করতে আরও বেগ পেতে হত।’
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সকালের স্মৃতিচারণ করেন খালেকুজ্জামান দাদুল। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের শেষদিকে আমি দেওয়ানবাজারে আমার এক আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নিই। ১৬ তারিখ সকালে আমি একটা রিকশা নিয়ে সার্কিট হাউজের সামনে আসি। তখনও বিভিন্ন জায়গায় গোলাগুলি হচ্ছিল। এর মধ্যেও আবার জনতা মিছিল বের করে উল্লাস করছিল। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যেভাবে হোক আমি সার্কিট হাউজে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা তুলব। সার্কিট হাউজে গিয়ে দেখি, লুটতরাজ চলছে। কেউ কেউ আসবাবপত্র নিয়ে বাইরে ফেলে দিচ্ছে। কেউ নিয়ে যাচ্ছে। সেখানে টর্চার সেল বানানো হয়েছিল। যে চেয়ারে বসিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের টর্চার করা হত, আমি সেটা দেখেছিলাম।’
‘আমি বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে সেখানে যাই। নিজে স্ট্যান্ডে উঠতে পারিনি। চট্টগ্রাম কলেজের একজন ছাত্র ছিল, শামীম। তাকে তুলে দিই। সে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে ফেলে। আমি বাংলাদেশের পতাকা তাকে দিই। সে সেটা বেঁধে দেয়’, বলেন দাদুল।
সভা শেষে এ তথ্যের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধের গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ডা. মাহফুজুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘এটা সত্য কথা যে, চট্টগ্রামে জনতা আগে বাংলাদেশের পতাকা তুলেছিল। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ করে। আমাদের এক নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর রফিকুল ইসলাম ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে পৌঁছাতে পারেননি, যেখানে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। পরদিন আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান হয়েছিল। কিন্তু চট্টগ্রামের জনতা নিজেরাই বিভিন্ন জায়গায় নিজ উদ্যোগে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তুলে দেয়। সার্কিট হাউজেও একদিন আগেই বাংলাদেশের পতাকা উঠেছিল, যদিও আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠান হয়েছে একদিন পরে।’
আবু সাঈদ সরদার বলেন, ’১৭ ডিসেম্বর সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে মুক্তিযোদ্ধারা চট্টগ্রামে রেডিও স্টেশন দখল করে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। এর আগে ১৪ ডিসেম্বর মৌলভী সৈয়দের গ্রুপের আমরা প্রায় ৩০০ জন মুক্তিযোদ্ধা আগ্রাবাদের মুহুরীপাড়ায় একটি বিলের মধ্যে জড়ো হয়। সেখান থেকে দেখি একটি মাইক্রোবাস এসে একটি বিল্ডিংয়ের সামনে থেমেছে। কয়েকজনকে পাঠানো হল ঘটনা দেখতে। দেখা গেল, একজন বাঙালি ড্রাইভারকে জিম্মি করে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে এসেছে হালিশহরের বাঙালি নিধন কমিটির সভাপতি ও সেক্রেটারি। তাদের ধরে আমরা রঙ্গীপাড়ায় গোপন সেলে নিয়ে যাই।’
‘জামালখানে তাওয়াক হোটেলে পাক বাহিনীর টর্চার সেল ছিল। ১৬ ডিসেম্বর সেখানে আমরা চারজন হিন্দু মেয়েকে পেয়ে তাদের উদ্ধার করি। তাদের বাড়ি ছিল বোয়ালখালী উপজেলার শাকপুরায়। তারা প্রত্যেকে ৭-৮ মাসের গর্ভবতী ছিল।’
উদ্বোধনী বক্তব্যে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি জানতে হবে, বুঝতে হবে এবং শিখতে হবে। হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। জানলেন-শিখলেন কিন্তু অন্তরে ধারণ করলেন না, তাহলে সেটা অর্থহীন হয়ে যাবে। এখন শুনলে মুক্তিযুদ্ধকে নতুন প্রজন্মের কেচ্ছাকাহিনী মনে হতে পারে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ কোনো কল্পকাহিনী নয়। এটা হৃদয় দিয়ে বুঝতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দল বলে তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে এবং তাদের প্রতিষ্ঠাতা একজন মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা হওয়া এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করার মধ্যে পার্থক্য আছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর যারা ক্ষমতায় এসেছে সেই খুনি মোশতাক থেকে শুরু করে জেনারেল জিয়া পর্যন্ত, সবাই মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস প্রজন্মের কাছে প্রচার করেছে। শুধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হত্যার জন্যই সেদিন ঘাতকেরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মতো পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল।’
শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার মাধ্যমে শিক্ষিত-দেশপ্রেমিক ও সুনাগরিক হয়ে গড়ে ওঠার আহ্বান জানান মেয়র।